ভাগ

আজ বৃহস্পতিবার কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের ছাত্রী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনুর হত্যাকাণ্ডের ১৩ মাস পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু তার (তনু) ঘাতকরা আজও শনাক্ত কিংবা গ্রেফতার হয়নি। যতই দিন যাচ্ছে তনুর বাবা-মা ও স্বজনদের মাঝে সুষ্ঠু তদন্ত আর বিচার পাওয়া নিয়ে ততই বাড়ছে সংশয় আর হতাশা।
তনুর বাবা-মা ও তার সহপাঠীসহ বিভিন্ন মহলের লোকজন বলছেন- ‘সেনানিবাসের মতো স্পর্শকাতর একটি এলাকা থেকে তনুর লাশ উদ্ধার করা হলো, অথচ এখনো কাউকে শনাক্ত করা গেল না- এটা কেমন বিষয়। তাকে তো কেউ না কেউ মেরেছে, জ্বীন বা ভুত-পেত্নিতো তাকে মেরে ফেলে যায়নি। তবে কেন ঘাতকরা আজও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।’ এদিকে তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে সাংবাদিকদের নিকট মুখ খুলছেন না মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরের একটি জঙ্গল থেকে গত বছরের ২০ মার্চ রাতে কলেজছাত্রী সোহাগী জাহান তনুর লাশ উদ্ধার করা হয়। পরদিন তার বাবা কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের অফিস সহায়ক ইয়ার হোসেন বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে কোতয়ালী মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। থানা পুলিশ ও ডিবির পর গত বছরের ১ এপ্রিল থেকে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি-কুমিল্লা। ওই বছরের মে মাসে তদন্তকারী সংস্থা সিআইডি তনুর জামা-কাপড় থেকে নেওয়া নমুনার ডিএনএ পরীক্ষা করে ৩ জনের শুক্রানু পাওয়ার কথা গণমাধ্যমকে জানিয়েছিল এবং হত্যার আগে তনুকে ধর্ষণ করা হয়েছিল বলে তারা নিশ্চিত হয়েছিল। তবে কেন, কোথায় এবং কীভাবে তনুকে হত্যা করা হয়েছে তা নিয়ে আজও বিভিন্ন মহলে নানা গুঞ্জন চলছে।

তনুর স্বজনরা জানান, ঘটনার পর পর ঘাতকদের গ্রেফতার ও বিচারের দাবিতে দেশব্যাপী প্রতিবাদের ঝড় ওঠলেও ধীরে ধীরে সবই থেমে গেছে। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ ছাড়াও দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠন, গণজাগরণ মঞ্চ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো একসময় সরব থাকলেও এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে এখন কেউ কথা বলছে না। তবে মামলার কোনো অগ্রগতির বিষয় জানতে চেয়ে সিআইডিকে ১০ দিনের সময় বেধে দিয়ে গত ২০ মার্চ আল্টিমেটাম দিয়ে কুমিল্লা পুলিশ সুপারের বরাবর এ স্মারকলিপি দাখিল করেছিল গণজাগরণ মঞ্চ-কুমিল্লা শাখার নেতৃবৃন্দ।

এছাড়া গত ১৪ এপ্রিল নববর্ষের দিন এ সংগঠনের পক্ষ থেকে তনু হত্যার বিচার দাবি করে মৌন মিছিল ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়েছিল। গণজাগরণ মঞ্চ-কুমিল্লার মুখপাত্র খায়রুল আনাম রায়হান বলেন, ‌‘তনু হত্যা মামলার কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেনি সিআইডি। এর প্রতিবাদে তদন্তের অগ্রগতি জানার জন্য স্মারকলিপি দাখিল করেছিলাম, কিন্তু এখনো এ বিষয়ে কিছু জানতে পারিনি।’

তিনি আরো বলেন, ‘সহসা সংবাদ সম্মেলন করে বিভিন্ন স্কুল-কলেজে ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে জনসচেতনতা সৃষ্টি করে লাগাতার আন্দোলনে নামবো। আশা করি, অচিরেই তনু হত্যাকারীদের শনাক্ত করে ঘাতকদের সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। এদিকে এই হত্যাকাণ্ডের জড়িত কেউ এখনও গ্রেফতার কিংবা শনাক্ত হয়নি। মামলার অগ্রগতিও জিজ্ঞাসাবাদেই আটকে আছে। তনুর লাশের দুই দফা ময়নাতদন্ত, মামলার তদন্তকারী সংস্থা ও কর্মকর্তা পরিবর্তন হলেও এ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি তনু হত্যা মামলা ‘

এদিকে দীর্ঘ এক বছরেও দেশব্যাপী আলোচিত তনু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত বা গ্রেফতার করতে না পারা, বিভিন্ন সময়ে সামরিক-বেসামরিক অর্ধশতাধিক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা, দুই দফা ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে মৃত্যুর কারণ অস্পষ্ট থাকা, এমনকি ডিএনএ পরীক্ষায় ৩ ধর্ষণকারীর শুক্রানু পেলেও এ পর্যন্ত ডিএনএ ম্যাচ করে ঘাতকদের সনাক্ত করতে না পারায় এ মামলার ভবিষ্যৎ কিংবা বিচার পাওয়া নিয়ে তনুর পরিবার, মানবাধিকার সংগঠনসহ বিভিন্ন মহল সংশয় প্রকাশ করেছে।

তনুর মা আনোয়ারা বেগম সাংবাদিকদের বলেন, ‘সিআইডি বলতেছে দেখতেছি-দেখতেছি, বিচার হবে। কিন্তু ১৩ মাসেও আমরা কিছু দেখতেছি না। এখন সিআইডি-ই ভালো জানে তারা কী দেখতেছে। আমরা ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত এবং সিআইডির তদন্ত কার্যক্রমে হতাশ হয়ে পড়েছি, মেয়ে হত্যার বিচার পাব কি-না জানি না। আমরা কোনো ব্যক্তি বা সংস্থার বিপক্ষে না, এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যে বা যারাই জড়িত থাকুক না কেন তাদের অবিলম্বে গ্রেফতারের দাবি জানাচ্ছি।’

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও সিআইডি-কুমিল্লার সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার জালাল উদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘মামলাটির তদন্ত নিজস্ব গতিতে চলছে, কিছুটা অগ্রগতি আছে, তাই তদন্তাধীন এ মামলার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করবো না।’