ভাগ

ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন সারাবিশ্বকে হতবাক করে দিয়ে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং আমেরিকা ও ইউরোপের রাজনৈতিক এলিট ক্লাসে হায় হায় পড়ে গিয়েছিল যে, ট্রাম্পের মতো ব্যক্তির জয়লাভে বিশ্বে না জানি কী অঘটন ঘটে; আমি তখন বাংলাদেশের একজন নগণ্য কলামিস্ট হওয়া সত্ত্বেও লিখেছিলাম, ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বে অঘটন ঘটাতে পারবেন কিনা এটা নির্ভর করে শক্তিশালী মার্কিন এস্টাবলিসমেন্টের সঙ্গে তার পেরে ওঠার উপর। কোনো কোনো রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক তাকে হিটলারের সঙ্গে তুলনা করতে শুরু করেছিলেন, এখানেও তাদের সঙ্গে সহমত পোষণের কোনো কারণ আমি খুঁজে পাইনি।

গত শতকের প্রায় মধ্যভাগে যখন জার্মানিতে হিটলারের অভ্যুত্থান ঘটে তখন জার্মান সিভিল এবং মিলিটারি এস্টাবলিসমেন্ট প্রথম মহাযুদ্ধে পরাজয়ের ধাক্কায় একেবারেই বিপর্যস্ত। যুদ্ধে জয়ী ব্রিটিশ নেতৃত্বাধীন মিত্রপক্ষ জার্মানির মাথায় অন্যায় ও অবমাননাকর ভার্সাই চুক্তি চাপিয়ে দেওয়ায় জার্মানির মানুষ ক্রুদ্ধ এবং হিটলারের পেছনে ঐক্যবদ্ধ। হিটলার যখন ক্ষমতায় আসেন তখন বিপর্যস্ত জার্মান এস্টাবলিস এবং দুর্বল হিডেলবার্গ-সরকার তাকে অবনত শিরে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। হিটলার তার নতুন সিভিল ও মিলিটারি এস্টাবলিসমেন্ট গড়ে তুলেছেন। মাত্র একটি ক্ষেত্রে হিটলারের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মিল আছে। হিটলার ইহুদি-বিদ্বেষকে তার রাজনীতির প্রধান মূলধন করেছিলেন। ট্রাম্প মুসলমান ও বহিরাগত-বিদ্বেষকে তার ইলেকশন ক্যাম্পেইনের প্রধান মূলধন করে হোয়াইট হাউসে ঢুকেছেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন নির্বাচনে জিতেছেন, তখন মার্কিন এস্টাবলিসমেন্ট বা ‘ইনভিজিবল গভরমেন্ট’ ইরাক ও সিরিয়ার যুদ্ধে ক্রেডিবিলিটি হারালেও পরাজিত বা বিপর্যস্ত নয়। ট্রাম্প রাজনীতিবিদ নন, একজন ব্যবসায়ী। ব্যবসাবুদ্ধি দ্বারা চালিত হয়ে তিনি হয়তো ভেবেছিলেন, অর্থ, নিজস্ব মিডিয়াশক্তি ও জনসমর্থনের জোরে তিনি এস্টাবলিসমেন্টকে থোড়াই কেয়ার করবেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও হয়তো এক সময় ভেবেছিলেন, বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তার জোরে মার্কিন হোয়াইট এস্টাবলিসমেন্টকে তিনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। জর্জ বুশ জুনিয়র আমেরিকাকে যে বিপর্যস্ত অবস্থায় রেখে গেছেন, তিনি তা থেকে দেশটাকে উদ্ধার করতে পারবেন।

কিন্তু প্রথম দফা হোয়াইট হাউসে অবস্থানের সময়েই তিনি বুঝতে পেরেছেন, সিন্দবাদের এই দৈত্যের কবল থেকে তার মুক্তি নেই। পুরো মেয়াদ কিংবা আরো একদফা তিনি হোয়াইট হাউসে থাকতে পারবেন, যদি এস্টাবলিসমেন্টের সঙ্গে আপস করে চলেন। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে তাকে বুশের যুদ্ধনীতি অনুসরণ করতে হয়েছে। তার কৃতিত্ব এই যুদ্ধের বিস্তার তিনি ঘটাতে দেননি। এস্টাবলিসমেন্টের চিরাচরিত রাশিয়া ও পুতিনবিরোধী নীতি তিনি অনুসরণ করেছেন। এস্টাবলিসমেন্টের ছক কাটা গণ্ডির মধ্যেই তিনি কিউবা ও ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি ঘটিয়েছেন। তার দু’ দফা প্রেসিডেন্সির আমলে ওবামা-কেয়ার নামে খ্যাত তার স্বাস্থ্য সেবা এবং কিছু সামাজিক সেবাখাতে উন্নতি ঘটানো ছাড়া মার্কিন রাজনীতিতে কোনো বড় চমক সৃষ্টি করে যেতে পারেননি। তার বড় বড় প্রতিশ্রুতিরও বাস্তবায়ন করে যেতে পারেননি। তিনি জানতেন, তার বড় বড় প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন করতে চাইলে তাকে প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির ভাগ্য বরণ করতে হবে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পও এই সত্যটি বুঝেছেন হোয়াইট হাউসে পা দিয়েই। তিনি ভেবেছিলেন, যেসব অসার হুমকি-ধামকি দিয়ে তিনি মার্কিন ভোটদাতাদের এক বিরাট অংশকে প্রভাবিত করেছেন; প্রতিশ্রুতির বন্যা বইয়ে দিয়েছিলেন, তাতে এস্টাবলিসমেন্ট সহজে তার ইচ্ছাপূরণে বাধা দেবে না। আমেরিকায় ট্রাম্পইজমের সহজ বিজয়বার্তা ঘোষিত হবে। তার ব্যবসায়ী বুদ্ধি এখানে সফল হয়নি। প্রেসিডেন্ট পদে তার নির্বাচনে মার্কিন এস্টাবলিসমেন্টের একটা অংশ খুশি হয়নি একথা তিনি জানতেন। কিন্তু এই এস্টাবলিসমেন্ট কতটা শক্তিশালী, সেটা তিনি হোয়াইট হাউসে বসার পর বুঝতে পেরেছেন।

প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরই তিনি এক্সিকিউটিভ অর্ডার দিয়েছিলেন, ছ’টি মুসলিম দেশ থেকে আমেরিকায় বহিরাগত আসা নিষিদ্ধ করে। এস্টাবলিসমেন্টের শক্তিশালী বাহু জুডিসিয়ারি তাকে আটকে দিয়েছিল। নির্বাচন-প্রচারণায় যে এক চীন নীতি বর্জনের ঘোষণা দিয়েছিলেন, তা থেকে তাকে সরে আসতে হয়েছে। চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকে রাজি হতে হয়েছে। সউদি আরবের কাছ থেকে সার্টিফিকেট আদায় করতে হয়েছে যে, তিনি মুসলমানদের বড় বন্ধু।

মার্কিন এস্টাবলিসমেন্ট কতটা শক্তিশালী তা ট্রাম্পকে এখন বুঝতে হচ্ছে পদে পদে। তিনি সবচাইতে অনড় ছিলেন রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্করক্ষা এবং ন্যাটোকে শক্তিশালী না করার সিদ্ধান্তে। এস্টাবলিসমেন্ট তাকে এই দুটি প্রশ্নে নতি স্বীকার করানোর জন্য ক্রমাগত তার উপর কঠিন চাপ প্রয়োগ করেছে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প পুতিনের সাহায্য পেয়েছেন এবং তা ছিল আমেরিকার স্বার্থ-বিরোধী এই প্রচারণাটি ক্রমশ শক্তিশালী করে তোলা হয় এবং মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এ সম্পর্কে নানা তথ্য ফাঁস করতে থাকে। ফলে প্রেসিডেন্টের এক প্রভাবশালী সহকর্মীকে চাকরি ছাড়তে হয়েছে। তদুপরি বৈরী রাশিয়ার সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আঁতাতের প্রচারণাটি ধীরে ধীরে নব নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে আষ্টেপৃষ্ঠে এমন বেঁধে ফেলতে চলেছিল যে, বুদ্ধিমান প্রেসিডেন্ট বুঝতে পেরেছিলেন এই মুহূর্তে রাশিয়ার সঙ্গে পিরিতের প্রশ্নে একটা বড় ইউটার্ন না নিলে তাকে প্রেসিডেন্ট নিক্সনের মতো ইমপিচমেন্টের সম্মুখীন হয়ে মাথায় কলঙ্কের গ্লানি নিয়ে হোয়াইট হাউস ছাড়তে হবে।

তাই সহসাই তিনি একটা ইউটার্ন নিয়েছেন। সিরিয়ায় কেমিক্যাল উইপন আসাদ সরকার ব্যবহার করেছে, না মার্কিন মদদপুষ্ট বিদ্রোহী বাহিনী তা ব্যবহার করে আসাদ সরকারের উপর দোষ চাপাচ্ছে সেটা প্রমাণিত হওয়ার আগেই তিনি সেখানে মিসাইল হামলা করেছেন। ফলে রাশিয়া ক্রুদ্ধ হয়েছে। রুশ-মার্কিন সম্পর্ক আবার বারাক ওবামার যুগে ফিরে যাচ্ছে। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার ন্যাটোবিরোধী মনোভাবও দ্রুত পাল্টেছেন। তিনি বলেছেন, রুশ-মার্কিন সম্পর্কের এখন সবচাইতে বেশি অবনতি ঘটেছে। ন্যাটো সংস্থা সম্পর্কে বলেছেন, তিনি ন্যাটোর উপর আস্থা ফিরে পেয়েছেন। অনেকদিন আগে তিনি মনে করতেন ন্যাটো একটি অকার্যকর সংস্থা, এটি বাতিল করতে হবে। এখন তার মত পাল্টেছে। তিনি মনে করেন, ন্যাটো সাফল্যের সঙ্গে টেরোরিজমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। এই প্রতিষ্ঠান বাতিল করার মতো নয়।

রাশিয়ার পক্ষ থেকেও পুতিনের প্রতিনিধি সার্জাই ল্যাভরব ঘোষণা করেছেন, “সিরিয়াসহ অন্যান্য সমস্যায় রাশিয়া ও আমেরিকার মধ্যে যে মতবিরোধ রয়েছে তার কোনো নিরসন হয়নি।” কোনো কোনো মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষকই বলছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মার্কিন এস্টাবলিসমেন্টের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠার অতি আগ্রহে দ্রুত তার রঙ পরিবর্তন শুরু করেছেন। তিনি রিচার্ড নিক্সনের ভাগ্য বরণ করতে চান না। চান রোনাল্ড রিগান হতে। রিগান হোয়াইট হাউসে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে আততায়ীর হামলায় আহত হন। তিনি সুস্থ হওয়ার পর এস্টাবলিসমেন্টের নীতির কাছে পুরোপুরি নতি স্বীকার করেছেন এবং অতীতে বি মুভির অখ্যাত অভিনেতা হওয়া সত্ত্বেও “গ্রেট প্রেসিডেন্ট” হিসেবে আখ্যাত হন। তিনিও রাশিয়াকে evil empire বা শয়তানের সাম্রাজ্য বলে আখ্যা দিয়েছিলেন।

প্রচণ্ড নিন্দার ও সমালোচনার মধ্যে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রেট প্রেসিডেন্ট হিসেবে ভবিষ্যতে আখ্যাত হতে পারেন, যদি তিনি শক্তিশালী মার্কিন এস্টাবলিসমেন্টের আজ্ঞা মেনে চলেন। প্রেসিডেন্টের বর্তমান কথাবার্তা ও কার্যকলাপ দেখে মনে হয়, তিনি আমেরিকার শক্তিশালী ওয়ার ইন্ডাস্ট্রির কর্পোরেট মালিকদের স্বার্থও মনে রেখে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে চাইবেন। সিরিয়ায় আকস্মিকভাবে মিসাইল হামলা এবং উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলকভাবে সাময়িক ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ আয়োজন দেখে মনে হয় ট্রাম্প হয়তো এখন যুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের নীতি অনুসরণ করবেন। উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক হামলা সম্পর্কে চীন ইতোমধ্যে আমেরিকাকে সতর্ক করে দিয়েছে।

ট্রাম্প প্রেসিডেন্সি সারা বিশ্বকে এক অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে তাতে সন্দেহ নেই। হুমকি-ধামকিতে তাকে যতটা স্ট্রংম্যান মনে হয়, তিনি তা নন। হোয়াইট হাউজে বসার পর তার চরিত্রের দুর্বলতাগুলো ধরা পড়তে শুরু করেছে এবং তিনি যে দ্রুত রঙ বদলাতে শুরু করেছেন, তাও আর অপ্রকাশ্য নয়। তার দল রিপাবলিকান পার্টির একটা প্রভাবশালী অংশ যুদ্ধবাদী এবং মার্কিন এস্টাবলিসমেন্টের একটা অংশও তাই। তার উপর রয়েছে প্রবল শক্তিশালী ওয়ার ইন্ডাস্ট্রির কর্পোরেট মালিকেরা। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধের বিস্তার এবং অস্ত্র বিক্রির বাজার সম্প্রসারণ যাদের লক্ষ্য।

কিন্তু বিশ্ব জনমত এখন আগের চাইতে অনেক সচেতন এবং শক্তিশালী। আমেরিকা এখনো একক সুপার পাওয়ার বটে, কিন্তু গণতান্ত্রিক বিশ্বের নেতা হিসেবে তার আগের ক্রেডিবিলিটি ও প্রভাব পতনমুখী। এই পতন ঠেকানোর জন্য জেফারসন বা রুজভেল্টের মতো প্রেসিডেন্ট চাই। রুজভেল্টের দূরদর্শী নিউ ডীল-নীতি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগে শুধু আমেরিকাকে নয়, সারাবিশ্বকে ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দা থেকে রক্ষা করেছিল। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর রুজভেল্টের উদ্যোগেই ঐতিহাসিক আটলান্টিক চার্টার স্বাক্ষরিত হয়েছিল। যে চার্টারে বিশ্বকে একটি যুদ্ধবিহীন এবং শান্তি ও সমৃদ্ধিপূর্ণ ভবিষ্যতের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল।

ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন বিশ্বের একক সুপার পাওয়ারের নেতা বটে, কিন্তু সেই নেতৃত্বের যোগ্যতা তিনি অর্জন করতে পারেন কিনা, তার উপরই আমেরিকা ও গণতান্ত্রিক বিশ্বের ভবিষ্যত্ নির্ভর করছে। তিনি প্রেসিডেন্ট পদে বসার সঙ্গে সঙ্গে ইউটার্ন নিয়েছেন, রঙ বদলাতে শুরু করেছেন। তা বিশ্বের জন্য মঙ্গল না অমঙ্গল ডেকে আনবে, তা সিরিয়া ও উত্তর কোরিয়া সম্পর্কে তার অনুসৃত নীতি থেকেই কিছুদিনের মধ্যে বোঝা যাবে।