ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই সরগরম হয়ে উঠছে নারায়ণগঞ্জের নির্বাচনী মাঠ। ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ছুটছেন প্রার্থীরা। গণসংযোগ, উঠান বৈঠক ও প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন সবাই। তবে এবারের নির্বাচনে একটি পরিবর্তন স্পষ্ট দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ ও প্রভাবশালী প্রার্থীদের পাশাপাশি তরুণ প্রার্থীদের সক্রিয় উপস্থিতি ভোটের মাঠে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
এই তরুণ প্রার্থীরা প্রচলিত পোস্টার-ব্যানার, মাইকিং বা সভা-সমাবেশের বাইরে গিয়ে ভিন্নধর্মী কৌশলে ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। স্থানীয় সমস্যা, নাগরিক সেবা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকে সামনে রেখে তারা সরাসরি মতবিনিময়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং তরুণ ভোটারদের সম্পৃক্ততাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই আধুনিক ও অংশগ্রহণমূলক প্রচারণা ভোটারদের মনোভাবেও প্রভাব ফেলছে, বিশেষ করে নতুন ও তরুণ ভোটারদের মধ্যে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অভিজ্ঞতা
এই তরুণদের একটি বড় অংশ ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। আন্দোলনের সময় সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতা তাদের রাজনৈতিক চেতনা ও কর্মকাণ্ডকে আরও পরিণত করেছে। আন্দোলন-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই অভিজ্ঞতার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে তাদের প্রচারণা ও বক্তব্যে, যা ভোটারদের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করছে।
নারায়ণগঞ্জ-৫ (সদর-বন্দর) আসনে তরুণ প্রার্থীদের মধ্যে আলোচনায় রয়েছেন গণসংহতি আন্দোলনের প্রার্থী তারিকুল ইসলাম সুজন। দীর্ঘদিন ধরে নগর জীবনের জলাবদ্ধতা, যানজট, বেকারত্ব, ডেঙ্গু, মাদক ও সন্ত্রাসের মতো সমস্যাগুলো নিয়ে তিনি সরব। তার প্রচারণার অন্যতম ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ‘হাতের মুঠোয় এমপি’ নামে একটি সিটিজেন কানেক্টেড অ্যাপ, যার মাধ্যমে ভোটাররা সরাসরি তাদের সমস্যা ও প্রস্তাব জানাতে পারবেন। এতে জনপ্রতিনিধি ও জনগণের দূরত্ব কমবে বলে মনে করেন তিনি।
এ ছাড়া ফজরের নামাজে অংশগ্রহণ, নামাজ শেষে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কুশল বিনিময় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় উপস্থিতির মাধ্যমে তিনি প্রচারণায় ভিন্নতা এনেছেন।
এ আসনেই গণঅধিকার পরিষদের তরুণ প্রার্থী নাহিদ হোসেন ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান তৈরি করছেন। পেশায় প্রকৌশলী নাহিদ হোসেন নিয়মিত মাঠে থাকা এবং স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকার কারণে তরুণদের মধ্যে পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন। জেলা পর্যায়ে দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকায় নেতা-কর্মীদের মধ্যেও তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে তরুণ প্রার্থী হিসেবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আব্দুল্লাহ আল আমিন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক হিসেবে পরিচিত এই তরুণ রাজনীতিক জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় জোট-সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন। তার প্রচারণায় একদিকে তরুণদের উচ্ছ্বাস, অন্যদিকে প্রবীণ ও ইসলামিক রাজনীতির নেতৃবৃন্দের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে, যা তার প্রচারণাকে বহুমাত্রিক রূপ দিয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে নজর কাড়ছেন গণঅধিকার পরিষদের ওয়াহিদুর রহমান মিল্কী ও গণসংহতি আন্দোলনের অঞ্জন দাস। মিল্কী কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত এবং দীর্ঘদিনের সক্রিয় ব্যবসায়ী নেতা। অপরদিকে শ্রমিক রাজনীতিতে সম্পৃক্ত অঞ্জন দাস খেটে খাওয়া মানুষের পাশে থাকার কারণে ভোটারদের কাছে পরিচিত মুখ।
নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে একমাত্র তরুণ প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন গণঅধিকার পরিষদের ওয়াসিম উদ্দিন। হেভিওয়েট প্রার্থীদের বিপরীতে তার সাহসী বক্তব্য ও মাঠপর্যায়ের সক্রিয়তা ভোটারদের মধ্যে আলোচনা তৈরি করেছে।
সব মিলিয়ে, এবারের নির্বাচনে তরুণ প্রার্থীরা কেবল বয়সের দিক থেকে নয় ভাবনা, কৌশল ও যোগাযোগের ধরনেও রাজনীতিতে নতুন প্রাণ সঞ্চার করছেন। অভিজ্ঞদের ভিড়ে তাদের এই সক্রিয় উপস্থিতি ভোটের সমীকরণে ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে।



















