৩৫ বছর মসজিদে একই কমিটি, প্রায় ৬০ লাখ টাকার আত্মসাৎ এর অভিযোগ
প্রতিষ্ঠানও কি এখন নিরাপদ নয়? যে মসজিদে মানুষ সওয়াবের আশায় দান করেন, আল্লাহর ঘরের বিভিন্ন কাজে সহযোগিতার জন্য অর্থ দেন—সেই মসজিদের আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়েই উঠেছে বড় ধরনের প্রশ্ন। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার শিবু মার্কেট এলাকার দরগা বাড়ি মসজিদে গত সাত বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব পর্যালোচনা করে প্রায় ৬০ লাখ টাকার গরমিলের অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় মুসল্লিরা।মুসল্লিদের অভিযোগ, মসজিদটি প্রায় ৩৫ বছর ধরে একই কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে আসছে। তবে দীর্ঘ এই সময়ে মসজিদের আয়-ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব নিয়মিতভাবে সাধারণ মুসল্লিদের সামনে উপস্থাপন করা হয়নি।মুসল্লিদের দাবি, মসজিদের আয়-ব্যয়ের প্রায় ১০ থেকে ১১টি খাতের মধ্যে এখন পর্যন্ত পাঁচটি খাতের হিসাব পর্যালোচনা করা হয়েছে। এসব পাঁচ খাতের হিসাবেই প্রায় ৬০ লাখ টাকার গরমিল পাওয়া গেছে বলে তাদের দাবি। আরও চার থেকে পাঁচটি খাতের হিসাব পর্যালোচনা এখনো চলমান রয়েছে। সেসব হিসাব পর্যালোচনা শেষে গরমিলের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন মুসল্লিরা।ঘটনার সূত্রপাত একটি এসি মেরামতকে কেন্দ্র করে। সম্প্রতি মসজিদের এসি নষ্ট হলে তা মেরামতের জন্য অর্থের প্রয়োজন হয়। কিন্তু মুসল্লিরা জানতে পারেন, মসজিদের ফান্ডে পর্যাপ্ত অর্থ নেই। এরপরই মসজিদের আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।হিসাব জানতে গত ১১ জুন ২০২৬ তারিখে কয়েকজন মুসল্লি মসজিদ কমিটির সভাপতি মো. সেলিমের কাছে লিখিত আবেদন করেন। পরে সভাপতির নির্দেশে ক্যাশিয়ার ও সাধারণ সম্পাদক মুসল্লিদের কাছে হিসাব উপস্থাপন করেন।মুসল্লিদের দাবি, প্রায় ৬৫০ পৃষ্ঠার একটি খাতায় সাত বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব উপস্থাপন করা হয়। ওই হিসাব পর্যালোচনা করতে গিয়ে বিভিন্ন খাতে অসঙ্গতি ও আর্থিক গরমিলের অভিযোগ সামনে আসে।মুসল্লিদের পক্ষ থেকে করা প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৫৭ লাখ ৪ হাজার ৩৪৩ টাকার গরমিল বা অস্বচ্ছতার অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত ১৪ আগস্ট শুক্রবার সাধারণ মুসল্লিদের পক্ষ থেকে এসব হিসাব উপস্থাপন করা হয়।অভিযোগের মধ্যে অন্যতম হলো ইমাম ও খাদেমদের বেতন বাবদ ব্যয়ের হিসাব। মুসল্লিদের দাবি, একই মাসে একাধিকবার ইমাম ও খাদেমদের বেতন দেওয়ার হিসাব দেখানো হয়েছে। এভাবে গত সাত বছরে এ খাতে প্রায় ১২ লাখ ৬২ হাজার টাকার গরমিলের অভিযোগ রয়েছে।এছাড়া মসজিদের টাইলস বাবদ ব্যয়ের হিসাবেও বড় ধরনের অসঙ্গতির অভিযোগ তুলেছেন মুসল্লিরা। তাদের দাবি, গত সাত বছরে টাইলস বাবদ প্রায় ২২ লাখ ২ হাজার ৯৪০ টাকা বেশি দেখানো হয়েছে।অভিযোগের বিষয়ে মসজিদ কমিটির সভাপতি মো. সেলিমের কাছে জানতে চাইলে তিনি আর্থিক অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি ঢাকায় থাকায় পুরো বিষয়টি এখনো পর্যালোচনা করতে পারেননি বলেও জানান।সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান হেনা জানান, অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চলছে।অন্যদিকে ক্যাশিয়ার দাবি করেন, তিনি নামমাত্র ক্যাশিয়ার এবং মসজিদের কোনো কাজে অংশ নেন না। তার মাধ্যমে কোনো টাকাও যায় না বলেও দাবি করেন তিনি।মসজিদের সহ-সভাপতি জানান, দীর্ঘদিন ধরে এসব চলে আসছে। তিনি এর প্রতিবাদ করায় ক্যাশিয়ারের দুই ছেলে তাকে হুমকি দিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন।অন্যদিকে মসজিদ কমিটির সদস্য শফিকের কাছে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তার ভাই এসে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান।তবে মুসল্লিদের সঙ্গে আলোচনার সময় সাধারণ সম্পাদক ও ক্যাশিয়ার হিসাবের গরমিলের বিষয়টি স্বীকার করেছেন বলে দাবি করেছেন স্থানীয় মুসল্লিরা। তাদের দাবি, তারা প্রায় ৩৫ লাখ টাকা মসজিদের বরাবরে পরিশোধ করার বিষয়ে সম্মতি জানিয়েছেন।মুসল্লিদের আরও দাবি, বাকি চার থেকে পাঁচটি খাতের হিসাব পর্যালোচনা শেষে পূর্ণাঙ্গ হিসাব তৈরি করা হবে। ওই হিসাব অনুযায়ী অতিরিক্ত কোনো অর্থের গরমিল পাওয়া গেলে সেটিও পরবর্তীতে মসজিদের বরাবরে পরিশোধ করা হবে বলে সাধারণ সম্পাদক ও ক্যাশিয়ার জানিয়েছেন।এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে—যদি এখন পর্যন্ত মাত্র পাঁচটি খাতের হিসাব পর্যালোচনায় প্রায় ৬০ লাখ টাকার গরমিলের অভিযোগ ওঠে, তাহলে বাকি খাতগুলোর হিসাব পর্যালোচনা শেষে মোট অঙ্ক কত দাঁড়াবে?আরও বড় প্রশ্ন, প্রায় ৩৫ বছর ধরে একই কমিটির মাধ্যমে মসজিদ পরিচালিত হয়ে থাকলে এত বছরের পূর্ণাঙ্গ আয়-ব্যয়ের হিসাব কোথায়?মুসল্লিদের দাবি, বর্তমানে মাত্র সাত বছরের হিসাব সামনে এসেছে। তাহলে বাকি প্রায় ২৮ বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাবও প্রকাশ্যে আনতে হবে।তাদের মতে, মসজিদের দানবাক্সের আয়, ব্যাংক হিসাব, নির্মাণ ও সংস্কারকাজের বিল-ভাউচার, ইমাম ও খাদেমদের বেতনসহ প্রতিটি খাতের আয়-ব্যয় নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।মুসল্লিরা বলছেন, মসজিদের অর্থ সাধারণ মানুষের দান করা অর্থ এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের আমানত। তাই এ অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।তাদের দাবি, গত ৩৫ বছরের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশের পাশাপাশি নিরপেক্ষ অডিটের মাধ্যমে অভিযোগগুলো যাচাই করা হোক। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।পাশাপাশি দীর্ঘদিনের বর্তমান কমিটি বিলুপ্ত করে সাধারণ মুসল্লিদের মতামতের ভিত্তিতে স্বচ্ছ, গ্রহণযোগ্য ও জবাবদিহিমূলক নতুন কমিটি গঠনের দাবিও জানিয়েছেন তারা।তবে মুসল্লিদের উত্থাপিত আর্থিক গরমিলের অভিযোগগুলো এখনো স্বাধীন কোনো অডিট বা তদন্তে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি। ফলে প্রকৃত সত্য উদঘাটনে মসজিদের সংশ্লিষ্ট সব নথি, ব্যাংক হিসাব, ভাউচার ও আয়-ব্যয়ের রেজিস্টার নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।এখন সাধারণ মুসল্লিদের প্রশ্ন একটাই—মসজিদের প্রতিটি টাকার হিসাব কি প্রকাশ্যে আসবে? আর ৩৫ বছরের আর্থিক ব্যবস্থাপনার প্রকৃত চিত্রই বা কী?