দক্ষিণ আফ্রিকার ইস্টার্ন কেপ প্রদেশের কুইন্সটাউনের একটি সুপারশপে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ছয়জন বাংলাদেশির মৃত্যুর ঘটনায় নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। নিহতদের মধ্যে পাঁচজন নারায়ণগঞ্জের এবং একজন মুন্সিগঞ্জের বাসিন্দা। দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার আলীরটেক ও বক্তাবলী ইউনিয়নের নিহতদের বাড়িতে চলছে স্বজনদের আহাজারি।মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) বিকেলে আলীরটেক ইউনিয়নের ক্রোকের চর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নিহত মো. আপন (২০)-এর বাড়িতে শোকের মাতম চলছে। নির্মাণাধীন বাড়ির সামনে স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। ছেলে হারানোর শোকে বারবার জ্ঞান হারাচ্ছিলেন মা আঁখি বেগম। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি শুধু বলছিলেন, “আমার পুতেরে আইন্না দেও।”নিহতের বড় ভাই, সৌদি প্রবাসী মো. জুয়েল জানান, প্রায় চার বছর আগে জীবিকার সন্ধানে দক্ষিণ আফ্রিকায় যান আপন। তিনি বলেন, “গতকালও ওর সঙ্গে কথা হয়েছে। স্বপ্ন ছিল বাড়িটা পাকা করবে, বাবা-মাকে নিয়ে থাকবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না।”তিনি আরও বলেন, “শুনেছি মরদেহ আগুনে পুড়ে গেছে। অন্তত ছাইটুকু দেশে আনতে পারলে কবর দিতে পারতাম।”একই গ্রামের নূর মোহাম্মদ (৫৫)-এর মৃত্যুতেও শোকের ছায়া নেমে এসেছে পরিবারে। তার স্ত্রী, তিন বোন ও স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। পরিবার জানায়, ২০১৯ সালে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় যান। তার উপার্জনের অর্থে দুই মেয়ের বিয়ে সম্পন্ন হয় এবং ছোট ছেলে সিয়াম এবার এইচএসসি পরীক্ষার্থী।নূর মোহাম্মদের ভাগনি ফিমা বলেন, “মামা দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু এভাবে ফিরবেন, কখনো ভাবিনি।”একই ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন প্রবাসী মো. ফাহিম। প্রায় ১০ বছর আগে পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় পাড়ি জমান। তার উপার্জনে দুই বোনের বিয়ে হয়েছে এবং যমজ দুই ভাইয়ের পড়াশোনা চলছিল। পরিবারের ইচ্ছা ছিল দেশে ফিরলে তার বিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু সেই স্বপ্নও অপূর্ণ থেকে গেল।ফাহিমের মৃত্যুর খবরে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন তার বাবা মনির হোসেন। আর মায়ের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো বাড়ির পরিবেশ।এ ছাড়া নিহতদের মধ্যে রয়েছেন আলীরটেক ইউনিয়নের তৈলখিরার চর গ্রামের ফারুক হোসেনের ছেলে মো. ফয়সাল (২৬), বক্তাবলী ইউনিয়নের কানাইনগর গ্রামের প্রয়াত আক্তার হোসেনের ছেলে মো. শাহিন (২৬) এবং মুন্সিগঞ্জের মিরকাদিম পৌরসভার কালিন্দিপাড়া এলাকার বাসিন্দা মো. রাজিক (৫৫)।এদিকে, নিহতদের মরদেহ দেশে আনা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। স্বজনদের একটাই আকুতি—যেভাবেই হোক, প্রিয়জনদের শেষ স্মৃতিটুকু যেন দেশে ফিরিয়ে এনে দাফনের সুযোগ করে দেওয়া হয়।