শিল্পাঞ্চল ফতুল্লা নিয়ে গঠিত নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনটি আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত আসনগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। একাধিক কোটিপতি ও প্রভাবশালী প্রার্থীর অংশগ্রহণ, বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিভক্তি এবং নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান সব মিলিয়ে এই আসনের নির্বাচনী সমীকরণ দিন দিন জটিল হয়ে উঠছে। ফলে ভোটের ফল নির্ধারণে সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর কী হবে টাকা, প্রতীক নাকি সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তি সে প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে ভোটারদের মাঝেও।
নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী, এই আসনে অন্তত ছয়জন প্রার্থী কোটিপতি। এর মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. শাহ আলম সবচেয়ে বেশি সম্পদশালী; তার ঘোষিত সম্পদের পরিমাণ ৬২ কোটিরও বেশি টাকা। আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিনের সম্পদ ১৭ কোটির বেশি। বিএনপি জোটের শরিক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রার্থী মুফতি মনির হোসাইন কাসেমীর সম্পদ ২ কোটি ৫ লাখ টাকার বেশি। রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী মোহাম্মদ আলীর সম্পদ প্রায় ৬ কোটি টাকা, জাতীয় পার্টির প্রার্থী মো. ছালাউদ্দিন খোকার প্রায় ৩ কোটি টাকা এবং খেলাফত মজলিসের প্রার্থী আনোয়ার হোসেনও কোটিপতি হিসেবে তালিকাভুক্ত।
রাজধানীর সন্নিকটবর্তী শিল্পসমৃদ্ধ এলাকা হওয়ায় নারায়ণগঞ্জে অর্থবান প্রার্থীদের আধিক্য নতুন নয়। অতীত নির্বাচনগুলোতেও এই আসনে অর্থবিত্তের প্রভাব স্পষ্ট ছিল। তবে এবার ভিন্নতা তৈরি করেছে বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থীর মাঠে সক্রিয় থাকা।
এই আসনটি দীর্ঘদিন ধরে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট নেতাদের দখলে ছিল। চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগ নেতা একেএম শামীম ওসমান। এখান থেকেই সংসদে গিয়েছিলেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী সারাহ বেগম কবরী। এর আগেও বিএনপির দুই প্রভাবশালী নেতা এই আসনের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
তফসিল ঘোষণার পর এই আসনে সর্বোচ্চ ১৫টি মনোনয়নপত্র জমা পড়ে। দু’জন প্রার্থী সরে দাঁড়ালেও বাকিরা এখনো মাঠে সরব। বিএনপি জোটের প্রার্থী হিসেবে ‘খেজুর গাছ’ প্রতীকে নির্বাচন করছেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মুফতি মনির হোসাইন কাসেমী। তবে তার বিপরীতে মাঠে রয়েছেন বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আলী ও মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন। পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপি নেতা মো. শাহ আলম।
গিয়াস উদ্দিন ও শাহ আলম দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে প্রার্থী হওয়ায় তাদের বহিষ্কার করা হয়েছে। দলীয় শাস্তি সত্ত্বেও তারা নিজ নিজ ভোটব্যাংক ও কর্মীবাহিনী নিয়ে মাঠ ছাড়েননি। এতে ঐতিহ্যগতভাবে শক্তিশালী বিএনপির ভোট একাধিক ভাগে বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এ বিভাজন আরও তীব্র হয়েছে রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী মোহাম্মদ আলীর কারণে। বিএনপির সাবেক এই সংসদ সদস্য নতুন দলের ব্যানারে নির্বাচন করলেও জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে তার অনুসারী বলয় এখনো সক্রিয় রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আলোচনায় এসেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল আমিন। গণঅভ্যুত্থানের পর তরুণ নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এনসিপির এই প্রার্থী জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ইসলামিক ও সমমনা ১১ দলের সমর্থন পেয়েছেন। আসন সমঝোতার অংশ হিসেবে জামায়াত তাদের প্রার্থী প্রত্যাহার করে তাকে সমর্থন দিয়েছে।
এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্যসচিব ও নারায়ণগঞ্জ জেলা সমন্বয় কমিটির প্রধান আব্দুল্লাহ আল আমিন নিয়মিত ওয়ার্ডভিত্তিক গণসংযোগ, উঠান বৈঠক ও সামাজিক কার্যক্রমের মাধ্যমে মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। পর্যবেক্ষকদের মতে, তরুণ ভোটারদের একটি বড় অংশ তার দিকে ঝুঁকছে।
তবে পিছিয়ে নেই বিএনপি জোটের প্রার্থী মুফতি মনির হোসাইন কাসেমীও। নির্বাচনী এলাকায় সক্রিয় গণসংযোগের পাশাপাশি তিনি বিএনপির একটি বড় অংশের নেতা-কর্মীর সমর্থন পাচ্ছেন। একাধিকবার বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান তার পক্ষে ভোট চাওয়ায় তিনি শক্ত অবস্থানে রয়েছেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। একই সঙ্গে ইসলামী রাজনীতিতে পরিচিত মুখ হওয়ায় ইসলামি ভোটের একটি অংশও তার দিকে ঝুঁকতে পারে।
এদিকে নির্বাচনী মাঠে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও কালো টাকার অভিযোগও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। প্রায় সব প্রার্থীই একে অপরের বিরুদ্ধে পেশিশক্তি ও অপরাধী চক্র ব্যবহারের অভিযোগ তুলছেন। সবাই সন্ত্রাসমুক্ত ফতুল্লার প্রতিশ্রুতি দিলেও ভোটারদের প্রশ্ন—যদি সবাই বিরোধিতা করেন, তবে আশ্রয় দিচ্ছে কারা?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই আসনের ফলাফল নির্ধারণে অর্থ ও সংগঠনের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখবে ভোট বিভাজন। বিএনপির ভোট একাধিক প্রার্থীর মধ্যে ভাগ হয়ে গেলে সংগঠিত জোটসমর্থন ও ধারাবাহিক মাঠকর্মসূচি থাকা প্রার্থী এগিয়ে যেতে পারেন। পাশাপাশি ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য ও স্থানীয় প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সব মিলিয়ে ফতুল্লার নির্বাচনী লড়াই কেবল কোটিপতি প্রার্থীদের শক্তি প্রদর্শনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এখানে টাকা, সংগঠন, রাজনৈতিক বিভক্তি ও নতুন নেতৃত্ব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক জটিল রাজনৈতিক সমীকরণ। এর চূড়ান্ত ফয়সালা দেবেন ভোটাররা আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ব্যালটের মাধ্যমে।



















