আজ ০৩ মার্চ ২০২৬, মঙ্গলবার সারাদেশে অব্যাহত ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়ন নির্মূলের দাবিতে বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন, নারায়ণগঞ্জ জেলার উদ্যোগে জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের সামনে এক সংক্ষিপ্ত মানববন্ধন শেষে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর ‘যৌন নিপীড়ন নির্মূল কমিশন’ গঠনসহ ১৮ দফা দাবিতে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়।
উল্লেখ্য, এর আগে টানা ৩ দিন যাবত সরকারি তোলারাম কলেজের শিক্ষার্থী ও ছাত্র ফেডারেশন কলেজ শাখার সদস্য সচিব মুন্নি আক্তার প্রত্যাশার নেতৃত্বে নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচি পালিত হয়। আজকের এই মানববন্ধন ও স্মারকলিপি প্রদানের মধ্য দিয়ে এই দফায় কর্মসূচি সমাপ্ত হয়।
মানববন্ধনে সভাপতির বক্তব্যে ছাত্র ফেডারেশন নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি ছাত্রনেতা সাইদুর রহমান বলেন,
“বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন দেশের ছাত্র সমাজের অধিকার রক্ষা এবং একটি গণতান্ত্রিক ও নিরাপদ সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছে। আমরা অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি যে, বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে নারী ও শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতা ও ধর্ষণের ঘটনা ভয়াবহ মহামারি আকার ধারণ করেছে। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটে যাওয়া প্রতিটি ধর্ষণের ঘটনা আমাদের স্তম্ভিত করে দেয়। প্রতিটি ঘটনার পর দেখা যায় বিচারহীনতার এক নির্লজ্জ সংস্কৃতি। আইনি দীর্ঘসূত্রতা এবং অপরাধীদের রাজনৈতিক ও সামাজিক আশ্রয়-প্রশ্রয় এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।
তিনি আরো বলেন,
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সমাজের প্রতিটি স্তরে নারীদের নিরাপত্তা আজ চরম হুমকির মুখে। বিচারহীনতার এই ধারা অব্যাহত থাকলে সমাজ চরম নৈরাজ্যের দিকে ধাবিত হবে। আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, শুধুমাত্র লোকদেখানো গ্রেফতার নয়, বরং সমসাময়িক সকল ধর্ষণের ঘটনার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্রকে প্রতিটি নাগরিকের, বিশেষ করে নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা পালন করতে হবে। এই অস্থিতিশীল ও অনিরাপদ পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়ে একটি বাসযোগ্য বাংলাদেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই আমরা আমাদের ১৮ দফা দাবি তুলে ধরছি।
সংগঠনের পক্ষ থেকে উত্থাপিত ১৮ দফা দাবি নিচে তুলে ধরা হলো:
১. বাংলাদেশে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতা স্থায়ীভাবে নির্মূল করতে একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন ‘যৌন নিপীড়ন নির্মূল কমিশন’ গঠন করতে হবে।
২. উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সকল সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ‘যৌন নিপীড়ন বিরোধী সেল’ কার্যকর করতে হবে এবং এর কার্যক্রম নিয়মিত মনিটরিং করতে হবে।
৩. নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় দায়েরকৃত সকল অনিষ্পন্ন মামলা দ্রুত সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি করে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে।
৪. ধর্ষকের যথাযোগ্য শাস্তি নিশ্চিত করতে বিদ্যমান আইনের কঠোরতম প্রয়োগ ও সর্বোচ্চ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৫. ধর্ষণের ঘটনায় মেডিকেল টেস্টের রিপোর্ট সর্বোচ্চ ৭২ ঘণ্টার মধ্যে প্রদান নিশ্চিত করতে হবে, যাতে দ্রুত চার্জশিট প্রদান সহজ হয়।
৬. দেশের ৬৪ জেলায় সক্রিয় ‘ভিক্টিম সাপোর্ট সেন্টার’ স্থাপন করতে হবে এবং প্রতিটি থানায় নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুর মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
৭. পুলিশ, আইনজীবী, বিচারক, জনপ্রতিনিধি ও সাংবাদিকদের জন্য বাধ্যতামূলক জেন্ডার (Gender) সংবেদনশীলতা প্রশিক্ষণ চালু করতে হবে।
৮. প্রতিটি জেলার লিগ্যাল এইড কার্যালয়গুলো সক্রিয় করতে হবে।
৯. লিগ্যাল এইড কার্যালয়ের হটলাইন এবং নারী ও শিশু নির্যাতন বিষয়ক হটলাইন ‘১০৯’ নম্বরের ব্যাপক প্রচারণার মাধ্যমে সর্বস্তরের মানুষকে সচেতন করতে হবে।
১০. সিডো (CEDAW) সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে এবং নারীর প্রতি বিদ্যমান সকল বৈষম্যমূলক আইনের ধারা ও প্রচলিত প্রথা বিলোপ করতে হবে।
১১. ধর্ষণের শিকার প্রত্যেকের রাষ্ট্রীয় খরচে সুচিকিৎসা (শারীরিক ও মানসিক) এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
১২. তদন্তকালীন সময়ে ভিকটিমকে কোনো প্রকার মানসিক নিপীড়ন বা হয়রানি করা বন্ধ করতে হবে।
১৩. বাংলাদেশে বসবাসরত সকল জাতিসত্তা ও সকল ধর্মের নারীদের ওপর সামরিক-বেসামরিক সব ধরনের যৌন ও সামাজিক নিপীড়ন বন্ধ করতে হবে।
১৪. সকল ধরনের সভা-সমাবেশ ও ধর্মীয় সভায় নারীবিদ্বেষী বক্তব্যকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে হবে।
১৫. সাহিত্য, নাটক, সিনেমা বা বিজ্ঞাপনে নারীকে পণ্য হিসেবে উপস্থাপন বন্ধ করতে হবে এবং পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন কঠোরভাবে কার্যকর করতে হবে।
১৬. পাঠ্যপুস্তক থেকে নারীর প্রতি অবমাননাকর ও বৈষম্যমূলক প্রবন্ধ, নিবন্ধ, ছবি ও শব্দ চয়ন পুরোপুরি পরিহার করতে হবে।
১৭. গ্রামীণ সালিশের মাধ্যমে ধর্ষণের ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা বা মামলা করতে বাধা দানকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে হবে।
১৮. তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ায় কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তির অবহেলা প্রমাণিত হলে তাকে বরখাস্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
স্মারকলিপি গ্রহণকালে জেলা প্রশাসক ছাত্র ফেডারেশনকে আশ্বস্ত করে বলেন, নারায়ণগঞ্জের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দ্রুততম সময়ে ‘যৌন নিপীড়ন বিরোধী সেল’ গঠন করা হবে এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত মনিটরিং নিশ্চিত করা হবে।
নারায়ণগঞ্জ জেলার সাধারণ সম্পাদক সৌরভ সেনের সঞ্চালনায় মানববন্ধনে আরও উপস্থিত ছিলেন জেলার সহ-সভাপতি সৃজয় সাহা ও ইউশা ইসলাম, সাংগঠনিক সম্পাদক শাহিন মৃধা, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মুক্ত শেখ, অর্থ সম্পাদক জান্নাতুল ফেরদৌস নিসা, দপ্তর সম্পাদক শেখ সাদী, রাজনৈতিক শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক মুন্নি আক্তার প্রত্যাশা এবং কার্যকরি সদস্য সিয়াম সরকার। এছাড়া তোলারাম কলেজ শাখার আহ্বায়ক রাইসা ইসলাম, নারায়ণগঞ্জ কলেজ শাখার আহ্বায়ক মৌমিতা আক্তার সহ বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন।




















