প্রাচ্যের ডান্ডিখ্যাত নারায়ণগঞ্জ জেলার সদর ও বন্দর উপজেলা নিয়ে গঠিত গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় আসন নারায়ণগঞ্জ-৫। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে মোট ১০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও ভোটের মাঠের বাস্তবতা, রাজনৈতিক সমীকরণ এবং প্রচারণার গতি-প্রকৃতি বিশ্লেষণে তিনজন প্রার্থীকে এগিয়ে রাখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
এগিয়ে থাকা এই তিনজন হলেন: বিএনপির প্রার্থী অ্যাডভোকেট আবুল কালাম, জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন দশ দলীয় জোটের শরিক খেলাফত মজলিসের এবিএম সিরাজুল মামুন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মাকসুদ হোসেন।
অ্যাডভোকেট আবুল কালাম এই আসন থেকে এর আগে তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। দীর্ঘ বিরতির পর তিনি এবার ষষ্ঠবারের মতো ‘ধানের শীষ’ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনী মাঠে নেমেছেন। অন্যদিকে, খেলাফত মজলিসের প্রার্থী এবিএম সিরাজুল মামুন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ‘দেওয়াল ঘড়ি’ প্রতীক নিয়ে। আর স্বতন্ত্র প্রার্থী মাকসুদ হোসেন ভোট চাইছেন ‘ফুটবল’ প্রতীকে।
এছাড়াও এ আসনে গণসংহতি আন্দোলনের তারিকুল ইসলাম সুজন (মাথাল), ইসলামী আন্দোলনের মুফতি মাছুম বিল্লাহ (হাতপাখা), ইসলামী ফ্রন্টের সৈয়দ বাহাদুর শাহ মুজাদ্দেদী (চেয়ার), বাসদের আবু নাঈম খান বিপ্লব (মই), বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের এইচ এম আমজাদ হোসেন মোল্লা (ছড়ি), সিপিবির মন্টু চন্দ্র ঘোষ (কাস্তে) এবং গণঅধিকার পরিষদের নাহিদ হোসেন (ট্রাক) নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় রয়েছেন।
ভোটের মাঠের সার্বিক পরিস্থিতি জানতে প্রেস নারায়ণগঞ্জ কথা বলেছে স্থানীয় রাজনীতিবিদ, পর্যবেক্ষক ও সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে। তাদের মতে, বর্তমানে ধানের শীষ, দেওয়াল ঘড়ি ও ফুটবল প্রতীকের প্রার্থীদের মধ্যেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠছে। প্রচারণায় কর্মী-সমর্থকদের উপস্থিতি এবং ভোটারদের সাড়াও সেই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ত্রিমুখী সমীকরণের বিশ্লেষণ
বিএনপির প্রার্থী আবুল কালাম দলটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মরহুম জালাল হাজীর সন্তান। তিনি নিজেও নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি ছিলেন। ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এমপি নির্বাচিত হওয়া এই রাজনীতিক অভিজ্ঞতা, পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য এবং শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামোর কারণে প্রভাবশালী প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত।
তার ছেলে আবুল কাউসার আশা মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর। তার নিজস্ব ভোটব্যাংক থাকায় বাবার নির্বাচনী প্রচারণায় তা ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। যদিও আশার কয়েকজন সমর্থকের কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা রয়েছে, তবুও আবুল কালামের ‘ক্লিন ইমেজ’ তাকে আলাদা অবস্থানে রেখেছে।
অন্যদিকে, ইসলামী আদর্শভিত্তিক নেতা এবিএম সিরাজুল মামুন স্থানীয়ভাবে ‘মোল্লা মামুন স্যার’ নামে পরিচিত। পেশায় ইংরেজি শিক্ষক এই নেতা দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা ও শৃঙ্খলাবোধ গড়ে তুলতে কাজ করে আসছেন। তিনি খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব এবং জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন দশ দলীয় জোটের সমর্থন পাচ্ছেন।
২০২২ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দেওয়াল ঘড়ি প্রতীকে অংশ নিয়ে তিনি ব্যাপক পরিচিতি পান। যদিও সে সময় ভোটসংখ্যা তুলনামূলক কম ছিল, তবে ধারাবাহিক সাংগঠনিক তৎপরতা ও ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা তাকে এবার শক্ত অবস্থানে নিয়ে এসেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে, স্বতন্ত্র প্রার্থী মাকসুদ হোসেন বন্দর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান। এর আগে তিনি একাধিকবার মুছাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। জাতীয় পার্টির জেলা সহসভাপতি থাকলেও ২০২৪ সালে দলীয় অবস্থানের বাইরে গিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় তিনি দলীয় পদ হারান।
তবে ওই উপজেলা নির্বাচনে প্রভাবশালী রাজনৈতিক বিরোধিতা উপেক্ষা করে আনারস প্রতীকে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে তিনি জেলার রাজনীতিতে আলোচিত ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। উন্নয়নমূলক কাজ ও মানবিক কর্মকাণ্ডে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার কারণে সদর ও বন্দর এলাকায় তার জনপ্রিয়তা বেড়েছে বলে জানান স্থানীয়রা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অভিজ্ঞ রাজনীতিক আবুল কালাম, ইসলামী আদর্শভিত্তিক নেতা এবিএম সিরাজুল মামুন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মাকসুদ হোসেন এই তিনজনকে ঘিরেই নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের মূল ভোটের লড়াই আবর্তিত হচ্ছে। অন্য প্রার্থীরা মাঠে থাকলেও শেষ পর্যন্ত এই ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতাই নির্বাচনের চূড়ান্ত চিত্র নির্ধারণ করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ফলে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের প্রতিটি ভোটকেন্দ্রের ফলাফল সাধারণ মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে। তবে শেষ পর্যন্ত কার হাতে উঠবে বিজয়ের হাসি তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে ভোটের দিন পর্যন্ত।



















