ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি আসনে নির্বাচনী উত্তাপ দিন দিন বাড়ছে। মাঠে দলীয় প্রার্থীরা বড় বহর নিয়ে সক্রিয় থাকলেও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ভিন্ন কৌশলে ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত লিফলেট বিতরণ, উঠান বৈঠক ও ঘরে ঘরে গিয়ে ভোট প্রার্থনার মাধ্যমে তারা সরাসরি সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।
এবার নারায়ণগঞ্জ জেলায় মোট সাতজন স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন একাই দুটি আসনে নারায়ণগঞ্জ-৩ ও ৪—ফুটবল প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।
এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসনে জাহাজ প্রতীকে যুবদলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মো. দুলাল হোসেন, নারায়ণগঞ্জ-২ (আড়াইহাজার) আসনে কলস প্রতীকে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য আতাউর রহমান আঙ্গুর, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে ঘোড়া প্রতীকে সাবেক প্রতিমন্ত্রী রেজাউল করিম, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে হরিণ প্রতীকে মোহাম্মদ শাহ আলম এবং নারায়ণগঞ্জ-৫ (সদর-বন্দর) আসনে ফুটবল প্রতীকে মাকসুদ হোসেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন।
মাকসুদ হোসেন ব্যতীত বাকি পাঁচজনই বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে পরিচিত। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে তাদের বহিষ্কার করা হলেও দলীয় পরিচয়ের বাইরে থেকেও নিজ নিজ এলাকায় তাদের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক ভিত্তি ও অনুসারী কর্মীসমর্থকরা প্রচারণায় সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন।
প্রচারণার ক্ষেত্রেও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কৌশল আলাদা। যেখানে দলীয় প্রার্থীরা বড় মিছিল ও নেতাকর্মীদের বহর নিয়ে মাঠে নামছেন, সেখানে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা পরিবার-পরিজন, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও নিজস্ব সমর্থকদের নিয়ে নীরব কিন্তু কার্যকর প্রচারণা চালাচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীরাও কৌশলে তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন।
নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. দুলাল হোসেন নির্বাচনী মাঠ ছাড়বেন না বলে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন। সাবেক ছাত্রদল নেতা হিসেবে পরিচিত দুলাল বিএনপির প্রার্থী মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপুর জন্য শক্ত চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছেন।
নারায়ণগঞ্জ-২ আসনে একমাত্র স্বতন্ত্র প্রার্থী আতাউর রহমান আঙ্গুর পরপর তিনবার বিএনপির মনোনয়নে নির্বাচন করে দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এলাকায় তার পারিবারিক ও রাজনৈতিক প্রভাব এখনো দৃশ্যমান। পাশাপাশি দলের মনোনয়নবঞ্চিত একাধিক কেন্দ্রীয় নেতার সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে সাবেক প্রতিমন্ত্রী রেজাউল করিম টানা চারবার বিএনপির প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করে তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও শক্তিশালী ভোটব্যাংক তাকে এই আসনে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত করেছে।
একই সময়ে মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন নারায়ণগঞ্জ-৩ ও ৪ দুই আসনেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন। ২০০১ সালে তিনি ধানের শীষ প্রতীকে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ও সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে এখনো এলাকায় তার প্রভাব বিদ্যমান।
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ শাহ আলম বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্যসহ জেলা ও থানা পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে অল্প ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হলেও তার দীর্ঘ রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা এখনো ভোটারদের মধ্যে প্রভাব ফেলছে।
নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে মাকসুদ হোসেন স্থানীয় সমস্যা ও উন্নয়ন ভাবনা তুলে ধরে নিয়মিত গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। নিজস্ব কর্মী ও সমর্থকদের নিয়ে তিনি ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলীয় প্রার্থীদের শক্ত অবস্থানের পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সক্রিয় উপস্থিতি নারায়ণগঞ্জের নির্বাচনী লড়াইকে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও উত্তেজনাকর করে তুলেছে। ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও মাঠপর্যায়ের প্রচারণার কারণে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ভোটারদের সামনে শক্ত বিকল্প হিসেবে উঠে আসছেন।



















