নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে নির্বাচনী প্রচারণা দিন দিন আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই জটিল ও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে এই আসনের রাজনৈতিক সমীকরণ। দলীয় প্রার্থীর পাশাপাশি একই দলের প্রভাবশালী স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর অংশগ্রহণে এখানে তৈরি হয়েছে ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা। সোনারগাঁ ও সিদ্ধিরগঞ্জ দুটি ভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার ভোটব্যাংক থাকায় এখনো কেউই নিশ্চিতভাবে এগিয়ে নেই বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
ঐতিহ্যবাহী সোনারগাঁ উপজেলা ও শিল্পাঞ্চল অধ্যুষিত সিদ্ধিরগঞ্জ থানা নিয়ে গঠিত নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ৯৩ হাজার ৩৪৬ জন। সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকায় গার্মেন্টস ও বিভিন্ন শিল্পকারখানার শ্রমজীবী ভোটারের সংখ্যা বেশি, অন্যদিকে সোনারগাঁ অংশে কৃষিনির্ভর জনগোষ্ঠী ও প্রবাসী পরিবারের ভোটারদের আধিক্য রয়েছে। নগর ও গ্রামীণ ভোটারের এই ভিন্ন প্রবণতাই আসনটিকে করে তুলেছে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। এই আসনে সংসদ সদস্য পদে মোট ১১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
এ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী আজহারুল ইসলাম মান্নান। তিনি দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং সোনারগাঁ উপজেলা বিএনপির সভাপতি। সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মান্নান একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেন। সোনারগাঁ উপজেলায় দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক তৎপরতার কারণে এ এলাকায় তার অবস্থান তুলনামূলকভাবে শক্ত এবং ভোটের মাঠে তিনি এগিয়ে রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে নতুন সীমানা পুনর্বিন্যাসের ফলে সিদ্ধিরগঞ্জ অংশ যুক্ত হওয়ায় সেখানে তার জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড মূলত সোনারগাঁকেন্দ্রিক হওয়ায় সিদ্ধিরগঞ্জে ভোট বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ শঙ্কা কাটাতে তিনি সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকায় জোরালো প্রচারণা চালাচ্ছেন। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে গণসংযোগে ব্যস্ত সময় পার করছেন মান্নান। জেলা বিএনপির শীর্ষ নেতারাও তার প্রচারণায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছেন, যা তাকে ভোটের মাঠে বাড়তি সুবিধা দিতে পারে।
বিএনপির প্রার্থীর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে রয়েছেন দলটির বহিষ্কৃত নেতা মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন। বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও জেলা কমিটির সাবেক সভাপতি গিয়াস উদ্দিন দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন। এ কারণে সম্প্রতি তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। ২০০১ সালে তিনি দলীয় মনোনয়ন নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন, সে সময় সিদ্ধিরগঞ্জ ছিল তার নির্বাচনী এলাকার অংশ। ফলে সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকাকে তার শক্ত ঘাঁটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
দল থেকে বহিষ্কৃত হলেও দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে গিয়াস উদ্দিনের একটি নিজস্ব অনুসারী গোষ্ঠী রয়েছে। দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে তার পক্ষে প্রচারণা চালানোর অভিযোগে ইতোমধ্যে সিদ্ধিরগঞ্জের একাধিক বিএনপি নেতাকর্মী বহিষ্কৃত হয়েছেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে নেমে তিনি বিএনপির দলীয় প্রার্থী মান্নানকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। তাদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও অভিযোগ নির্বাচনী উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
এ আসনে আরেক বহিষ্কৃত বিএনপি নেতা ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী রেজাউল করিমও স্বতন্ত্রভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। সোনারগাঁয়ের প্রভাবশালী নেতা হলেও মাঠপর্যায়ে তার প্রচারণা তুলনামূলকভাবে সীমিত। তবে তার পক্ষে প্রচারণার অভিযোগেও কয়েকজন বিএনপি নেতা বহিষ্কৃত হয়েছেন।
অন্যদিকে, নানা নাটকীয়তার পর নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় হয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাওলানা মো. ইকবাল হোসেন ভূঁইয়া। তার প্রত্যাবর্তনে ইসলামপন্থি ভোটারদের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে ইসলামপন্থি ও সমমনা দলগুলোর জোটে প্রকাশ্য বিভাজন দেখা দিয়েছে, যা এই আসনের ভোটের সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
সোনারগাঁ উপজেলায় ইসলামপন্থিদের একটি উল্লেখযোগ্য ভোটব্যাংক থাকলেও তা বিভিন্ন দলের মধ্যে বিভক্ত। শুরুতে জোট গঠনের ফলে এই ভোটব্যাংক একত্রিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলেও মতানৈক্যের কারণে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জোট থেকে বেরিয়ে যায়। পরে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী হিসেবে মো. শাহজাহান শিবলীর নাম ঘোষণা করা হয়। যদিও প্রথমে জামায়াত প্রার্থী ইকবাল হোসেন ভূঁইয়া তাকে সমর্থন দিলেও সম্প্রতি নিজেকে জোটের প্রার্থী দাবি করে প্রচারণা চালাচ্ছেন, যা জোটের ভেতরে নতুন করে বিরোধ সৃষ্টি করেছে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী শাহজাহান শিবলী এক সংবাদ সম্মেলনে ইকবাল হোসেন ভূঁইয়াকে ‘অবৈধ প্রার্থী’ উল্লেখ করে বলেন, জোটের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে রিকশা প্রতীক বরাদ্দ রয়েছে এবং এর বাইরে অন্য কোনো সিদ্ধান্ত কার্যকর নয়।
এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী গোলাম মসীহেরও একটি স্বতন্ত্র ভোটব্যাংক রয়েছে। পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি ও ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতার কারণে দলীয় হিসাবের বাইরেও অনেক ভোটার তার প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন। তিনি সাবেক রাষ্ট্রদূত ও জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং সোনারগাঁয়ের একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হিসেবে এলাকায় তার সামাজিক প্রভাব রয়েছে।
এই আসনে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলন, আমার বাংলাদেশ পার্টি ও খেলাফত আন্দোলনের প্রার্থীরা। যদিও তারা মূল লড়াইয়ের কেন্দ্রে নেই, তবে ভোট বিভক্তির ক্ষেত্রে তাদের প্রভাব পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।



















