- ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা) আসনের নির্বাচনী পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। বিএনপি জোটের প্রার্থী হিসেবে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামীর জেলা সভাপতি মুফতি মনির হোসাইন কাশেমী নির্বাচনী মাঠে থাকলেও বাস্তবতায় তিনি ধীরে ধীরে কঠিন অবস্থার মুখে পড়ছেন। ভোটারদের সরাসরি সমর্থনের চেয়ে বিএনপির সাংগঠনিক শক্তির ওপরই যেন এখন তার মূল নির্ভরতা।
এই আসনে কাশেমীর বিপরীতে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সাবেক সদস্য মো. শাহা আলম এবং বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী মোহাম্মদ আলী। দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতিতে সক্রিয় এসব প্রার্থীর প্রত্যেকেরই নিজ নিজ এলাকায় পরিচিতি ও স্বতন্ত্র ভোটব্যাংক রয়েছে। ফলে শুরু থেকেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার চাপ কাশেমীর ওপর তুলনামূলকভাবে বেশি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গত ২৭ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা অডিটোরিয়ামে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক সভায় এই তিন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে একসঙ্গে দেখা যায়। সভায় তাদের স্বতঃস্ফূর্ত ও সৌহার্দ্যপূর্ণ উপস্থিতি স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। অনেকের ধারণা, এই তিন ‘হেভিওয়েট’ প্রার্থীর সম্মিলিত উপস্থিতিই কাশেমীর নির্বাচনী পথকে আরও কঠিন করে তুলছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কাশেমীর বড় দুর্বলতার জায়গা হলো দীর্ঘদিন এলাকায় অনুপস্থিত থাকা। বিগত কয়েক বছরে তিনি রাজপথের রাজনীতিতে তেমন সক্রিয় ছিলেন না, এমনকি নির্বাচনী এলাকাতেও নিয়মিত উপস্থিত ছিলেন না। ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জোটের প্রার্থী হলেও তাকে মাঠে খুব একটা দেখা যায়নি। পরবর্তী সময়ে ভোটারদের সঙ্গে তার যোগাযোগও প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ফলে এবারের নির্বাচনে এসে ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক গড়ে তুলতে তিনি অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছেন।
বর্তমানে তার প্রচারণার বড় অংশ জুড়ে রয়েছে বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে বৈঠক, সভা ও সাংগঠনিক কার্যক্রম। ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাওয়ার পরিবর্তে দলীয় ভেতরের সমর্থন নিশ্চিত করতেই তিনি বেশি মনোযোগী এমন অভিযোগ করছেন স্থানীয়রা। নারায়ণগঞ্জে অনুষ্ঠিত বিএনপির দুটি জনসভায় দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রকাশ্যে তাকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে তার পক্ষে ভোট চান। পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের বিএনপির কিছু নেতাকর্মীকেও তার পক্ষে কর্মসূচি পালন করতে দেখা যাচ্ছে।
তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র ভিন্ন বলেই দাবি স্থানীয়দের। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই আসনের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোটার এখনো ব্যক্তিগতভাবে মুফতি মনির হোসাইন কাশেমীকে চেনেন না। এমনকি তার নির্বাচনী প্রতীক ‘খেজুর গাছ’ও অনেকের কাছে অপরিচিত। ২২ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হলেও এলাকায় তার উপস্থিতি তেমনভাবে চোখে পড়েনি। কিছু এলাকায় পোস্টার ও সীমিত প্রচারণা থাকলেও ভোটারদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য আগ্রহ বা সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
দলীয় সিদ্ধান্তের কারণে বিএনপি জোটের কিছু নেতাকর্মী তার পক্ষে মাঠে থাকলেও তৃণমূল পর্যায়ের অনেক নেতার মতে, এই সমর্থন অনেকটাই আনুষ্ঠানিক। স্থানীয় বিএনপির একটি বড় অংশ নীরব থাকায় ভোটারদের মধ্যেও বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক নেতাকর্মী জানান, দীর্ঘদিন যারা এলাকায় রাজনীতি করেছেন এবং মানুষের সুখ-দুঃখে পাশে ছিলেন, তাদের বাদ দিয়ে বাইরের একজন প্রার্থী চাপিয়ে দেওয়ায় অনেকের মনোবল ভেঙে পড়েছে।
সব মিলিয়ে পরিচিতির ঘাটতি, দুর্বল মাঠপর্যায়ের সংগঠন এবং ভোটারদের আস্থার সংকট এই তিন বড় চ্যালেঞ্জ নিয়েই এগোতে হচ্ছে মুফতি মনির হোসাইন কাশেমীকে। এমন পরিস্থিতিতে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে শেষ পর্যন্ত ভোটের ফল কোন দিকে মোড় নেয়, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে কৌতূহল দিন দিন বাড়ছে।



















