গভীর রাত। বাইরে ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে। ছোট্ট শিশুটি জ্বরে কাঁপছে। নির্ঘুম মা সারারাত ভেজা কাপড় কপালে দিয়ে যাচ্ছেন। বুকে জড়িয়ে ধরে আস্তে আস্তে গুনগুনিয়ে ঘুমপাড়ানি গান গাইছেন। শিশুটি হয়তো বড় হয়ে সেই রাতের কিছুই মনে রাখবে না। কিন্তু সেই মা আজও বুকের গভীরে আগলে রেখেছেন প্রতিটি মুহূর্ত।
পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃস্বার্থ সম্পর্কের নাম মা। এই একটি শব্দের ভেতরেই লুকিয়ে আছে আশ্রয়, নিরাপত্তা, মায়া, ত্যাগ ও নিঃশর্ত ভালোবাসার বিশাল এক জগৎ। মানুষ জীবনে অনেক সম্পর্কের মুখোমুখি হয়, কিন্তু মা ও সন্তানের সম্পর্কের গভীরতা ও পবিত্রতার সঙ্গে কোনো কিছুর তুলনা চলে না।
একটি শিশু পৃথিবীতে আসার পর প্রথম যে উষ্ণতা অনুভব করে, তা মায়ের বুকের। প্রথম যে কণ্ঠস্বর তার কানে পৌঁছায়, তা মায়ের। মা শুধু সন্তান জন্ম দেন না, প্রতিনিয়ত নিজেকে ভেঙে একটি নতুন মানুষ গড়ে তোলেন। রাতের পর রাত জেগে অসুস্থ সন্তানের মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। নিজের ক্ষুধা ভুলে সন্তানের পাতে খাবার তুলে দেন। নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে সন্তানের মুখে হাসি ফোটান। এই ত্যাগের কোনো পরিমাপ নেই, এই মমতার কোনো বিনিময় হয় না।
“মা” শুধু একটি শব্দ নয়, এটি যেন এক সম্পূর্ণ পৃথিবী। যে পৃথিবীতে ক্লান্ত মানুষ আশ্রয় খুঁজে পায়, ভয় পেলে ফিরে যেতে চায়, আর কষ্ট পেলে মাথা রাখতে চায় নিশ্চিন্ত এক বুকে। কোনো ভাষা, কোনো কবিতা কিংবা কোনো গান মায়ের ভালোবাসাকে পুরোপুরি ধারণ করতে পারে না। তবুও প্রতি বছর মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার বিশ্বজুড়ে পালিত হয় মা দিবস। এই দিনটি পৃথিবীর সব মায়ের প্রতি ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা জানানোর এক ছোট্ট উপলক্ষ।
মা দিবসের ইতিহাসও জন্ম নিয়েছে একজন সন্তানের মায়ের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা থেকে। যুক্তরাষ্ট্রের আনা জার্ভিস তার মা অ্যান রিভস জার্ভিসের স্মৃতিকে সম্মান জানাতে বিংশ শতাব্দীর শুরুতে মা দিবস পালনের উদ্যোগ নেন। তার অক্লান্ত প্রচেষ্টায় ১৯১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে দিনটি আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভ করে। এরপর ধীরে ধীরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মা দিবস উদযাপিত হতে শুরু করে।
কিন্তু বাস্তবতা সবসময় এত সুন্দর নয়।
যে মা সন্তানের জন্য নিজের জীবন, ঘুম ও স্বপ্ন বিলিয়ে দেন, জীবনের শেষ বয়সে তিনিই অনেক সময় ঠাঁই পান বৃদ্ধাশ্রমে। সন্তানের ছোট্ট একটি হাসির জন্য যিনি সারাজীবন লড়াই করেছেন, বৃদ্ধ বয়সে তিনিই অপেক্ষায় থাকেন একটি ফোনকলের, একটু সময়ের, কিংবা সন্তানের পাশে এসে একবার বসার। আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, পারিবারিক দূরত্ব ও আত্মকেন্দ্রিকতার ভিড়ে অনেক মা আজ নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ছেন।
শুধু বার্ধক্যে নয়, মাতৃত্বের শুরুতেও বহু নারী অবহেলার শিকার হন। গর্ভাবস্থায় প্রয়োজনীয় পুষ্টি, বিশ্রাম ও চিকিৎসার অভাবে এখনও অসংখ্য মা জটিলতায় ভোগেন। অনেক পরিবারে গর্ভবতী মায়ের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকটিও গুরুত্ব পায় না। কোথাও কোথাও সন্তান জন্মদানকে এখনো শুধু নারীর “দায়িত্ব” হিসেবে দেখা হয়, অথচ তার শারীরিক কষ্ট, ভয়, মানসিক পরিবর্তন কিংবা মৃত্যুর ঝুঁকির কথা খুব কমই ভাবা হয়।
বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে এখনও প্রসবকালীন জটিলতায় মায়েদের মৃত্যু ঘটে। একটি নতুন প্রাণ পৃথিবীতে আনতে গিয়ে অনেক মা নিজের জীবন হারান। এর চেয়ে নির্মম বাস্তবতা আর কী হতে পারে? অথচ সচেতনতা, সময়মতো চিকিৎসা ও পরিবারের যত্ন পেলে এসব মৃত্যু অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব।
একজন মা শুধু সন্তানের জন্ম দেন না, তিনি একটি পরিবার, একটি সমাজ এবং একটি উন্নত ভবিষ্যৎ গড়ে তোলেন। তাই মায়ের প্রতি সম্মান শুধু আবেগের বিষয় নয়, এটি একটি সামাজিক দায়িত্বও। গর্ভাবস্থায় মায়ের পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা ও মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি বৃদ্ধ বয়সে তার সম্মান, যত্ন ও সঙ্গ দেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
মায়ের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের জন্য দামি উপহারের প্রয়োজন হয় না। একজন মায়ের কাছে সবচেয়ে বড় উপহার হলো সন্তানের একটু সময়, আন্তরিক যত্ন, সম্মান ও পাশে থাকার আশ্বাস। কারণ শেষ পর্যন্ত একজন মা শুধু এটুকুই চান—সন্তানের জীবনে তিনি যেন অবহেলিত না হন।
মা দিবসে পৃথিবীর সব মায়ের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। শুধু একটি দিনের জন্য নয়, বছরের প্রতিটি দিন যেন তারা প্রাপ্য সম্মান, নিরাপত্তা, যত্ন ও ভালোবাসা পান—সেটিই হোক আমাদের অঙ্গীকার। কারণ পৃথিবীতে মায়ের মতো নিরাপদ আশ্রয় আর কোথাও নেই।
লেখক: সাংবাদিক আসমাউল হুসনা

সোমবার, ১১ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১০ মে ২০২৬
গভীর রাত। বাইরে ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে। ছোট্ট শিশুটি জ্বরে কাঁপছে। নির্ঘুম মা সারারাত ভেজা কাপড় কপালে দিয়ে যাচ্ছেন। বুকে জড়িয়ে ধরে আস্তে আস্তে গুনগুনিয়ে ঘুমপাড়ানি গান গাইছেন। শিশুটি হয়তো বড় হয়ে সেই রাতের কিছুই মনে রাখবে না। কিন্তু সেই মা আজও বুকের গভীরে আগলে রেখেছেন প্রতিটি মুহূর্ত।
পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃস্বার্থ সম্পর্কের নাম মা। এই একটি শব্দের ভেতরেই লুকিয়ে আছে আশ্রয়, নিরাপত্তা, মায়া, ত্যাগ ও নিঃশর্ত ভালোবাসার বিশাল এক জগৎ। মানুষ জীবনে অনেক সম্পর্কের মুখোমুখি হয়, কিন্তু মা ও সন্তানের সম্পর্কের গভীরতা ও পবিত্রতার সঙ্গে কোনো কিছুর তুলনা চলে না।
একটি শিশু পৃথিবীতে আসার পর প্রথম যে উষ্ণতা অনুভব করে, তা মায়ের বুকের। প্রথম যে কণ্ঠস্বর তার কানে পৌঁছায়, তা মায়ের। মা শুধু সন্তান জন্ম দেন না, প্রতিনিয়ত নিজেকে ভেঙে একটি নতুন মানুষ গড়ে তোলেন। রাতের পর রাত জেগে অসুস্থ সন্তানের মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। নিজের ক্ষুধা ভুলে সন্তানের পাতে খাবার তুলে দেন। নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে সন্তানের মুখে হাসি ফোটান। এই ত্যাগের কোনো পরিমাপ নেই, এই মমতার কোনো বিনিময় হয় না।
“মা” শুধু একটি শব্দ নয়, এটি যেন এক সম্পূর্ণ পৃথিবী। যে পৃথিবীতে ক্লান্ত মানুষ আশ্রয় খুঁজে পায়, ভয় পেলে ফিরে যেতে চায়, আর কষ্ট পেলে মাথা রাখতে চায় নিশ্চিন্ত এক বুকে। কোনো ভাষা, কোনো কবিতা কিংবা কোনো গান মায়ের ভালোবাসাকে পুরোপুরি ধারণ করতে পারে না। তবুও প্রতি বছর মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার বিশ্বজুড়ে পালিত হয় মা দিবস। এই দিনটি পৃথিবীর সব মায়ের প্রতি ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা জানানোর এক ছোট্ট উপলক্ষ।
মা দিবসের ইতিহাসও জন্ম নিয়েছে একজন সন্তানের মায়ের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা থেকে। যুক্তরাষ্ট্রের আনা জার্ভিস তার মা অ্যান রিভস জার্ভিসের স্মৃতিকে সম্মান জানাতে বিংশ শতাব্দীর শুরুতে মা দিবস পালনের উদ্যোগ নেন। তার অক্লান্ত প্রচেষ্টায় ১৯১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে দিনটি আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভ করে। এরপর ধীরে ধীরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মা দিবস উদযাপিত হতে শুরু করে।
কিন্তু বাস্তবতা সবসময় এত সুন্দর নয়।
যে মা সন্তানের জন্য নিজের জীবন, ঘুম ও স্বপ্ন বিলিয়ে দেন, জীবনের শেষ বয়সে তিনিই অনেক সময় ঠাঁই পান বৃদ্ধাশ্রমে। সন্তানের ছোট্ট একটি হাসির জন্য যিনি সারাজীবন লড়াই করেছেন, বৃদ্ধ বয়সে তিনিই অপেক্ষায় থাকেন একটি ফোনকলের, একটু সময়ের, কিংবা সন্তানের পাশে এসে একবার বসার। আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, পারিবারিক দূরত্ব ও আত্মকেন্দ্রিকতার ভিড়ে অনেক মা আজ নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ছেন।
শুধু বার্ধক্যে নয়, মাতৃত্বের শুরুতেও বহু নারী অবহেলার শিকার হন। গর্ভাবস্থায় প্রয়োজনীয় পুষ্টি, বিশ্রাম ও চিকিৎসার অভাবে এখনও অসংখ্য মা জটিলতায় ভোগেন। অনেক পরিবারে গর্ভবতী মায়ের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকটিও গুরুত্ব পায় না। কোথাও কোথাও সন্তান জন্মদানকে এখনো শুধু নারীর “দায়িত্ব” হিসেবে দেখা হয়, অথচ তার শারীরিক কষ্ট, ভয়, মানসিক পরিবর্তন কিংবা মৃত্যুর ঝুঁকির কথা খুব কমই ভাবা হয়।
বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে এখনও প্রসবকালীন জটিলতায় মায়েদের মৃত্যু ঘটে। একটি নতুন প্রাণ পৃথিবীতে আনতে গিয়ে অনেক মা নিজের জীবন হারান। এর চেয়ে নির্মম বাস্তবতা আর কী হতে পারে? অথচ সচেতনতা, সময়মতো চিকিৎসা ও পরিবারের যত্ন পেলে এসব মৃত্যু অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব।
একজন মা শুধু সন্তানের জন্ম দেন না, তিনি একটি পরিবার, একটি সমাজ এবং একটি উন্নত ভবিষ্যৎ গড়ে তোলেন। তাই মায়ের প্রতি সম্মান শুধু আবেগের বিষয় নয়, এটি একটি সামাজিক দায়িত্বও। গর্ভাবস্থায় মায়ের পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা ও মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি বৃদ্ধ বয়সে তার সম্মান, যত্ন ও সঙ্গ দেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
মায়ের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের জন্য দামি উপহারের প্রয়োজন হয় না। একজন মায়ের কাছে সবচেয়ে বড় উপহার হলো সন্তানের একটু সময়, আন্তরিক যত্ন, সম্মান ও পাশে থাকার আশ্বাস। কারণ শেষ পর্যন্ত একজন মা শুধু এটুকুই চান—সন্তানের জীবনে তিনি যেন অবহেলিত না হন।
মা দিবসে পৃথিবীর সব মায়ের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। শুধু একটি দিনের জন্য নয়, বছরের প্রতিটি দিন যেন তারা প্রাপ্য সম্মান, নিরাপত্তা, যত্ন ও ভালোবাসা পান—সেটিই হোক আমাদের অঙ্গীকার। কারণ পৃথিবীতে মায়ের মতো নিরাপদ আশ্রয় আর কোথাও নেই।
লেখক: সাংবাদিক আসমাউল হুসনা

আপনার মতামত লিখুন