দুর্গাপ্রতিমা তৈরিতে যৌনপল্লির মাটি ব্যবহারের প্রচলন, নেপথ্যে কী বিশ্বাস?
শারদীয় দুর্গোৎসবে দেবী দুর্গার প্রতিমা তৈরির সঙ্গে জড়িয়ে আছে নানা ধর্মীয় আচার ও লোকজ বিশ্বাস। সাধারণত নদীর পলিমাটি, খড় ও বাঁশসহ বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে প্রতিমা নির্মাণ করা হয়। তবে বাংলার কিছু অঞ্চলে প্রতিমা তৈরির সঙ্গে যৌনপল্লির মাটি ব্যবহারের একটি প্রচলিত রীতির কথাও শোনা যায়। এই প্রথা ঘিরে ধর্মীয় বিশ্বাস, পৌরাণিক কাহিনি এবং সামাজিক তাৎপর্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে।
লোকাচার অনুযায়ী, যৌনপল্লি থেকে সংগ্রহ করা মাটিকে কোথাও ‘পুণ্যমাটি’, আবার কোথাও ‘নিষিদ্ধপল্লির মাটি’ বলা হয়। প্রচলিত বর্ণনায়, এই মাটি প্রতিমা তৈরির অন্যান্য উপকরণের সঙ্গে মেশানো হয়। তবে সব জায়গায় এ রীতি অনুসরণ করা হয় না। অঞ্চল, মন্দির ও প্রতিমাশিল্পীদের নিজস্ব রীতিভেদে এর চর্চায় পার্থক্য রয়েছে।
‘পুণ্যমাটি’ নিয়ে প্রচলিত বিশ্বাস
দুর্গাপ্রতিমা তৈরির উপকরণ নিয়ে বিভিন্ন লোকাচারে গঙ্গার পলিমাটি, গোবর, গোমূত্রসহ কয়েকটি উপাদানের উল্লেখ পাওয়া যায়। কিছু বর্ণনায় সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষের বসতভিটার মাটির কথাও বলা হয়েছে। এর মধ্যে যৌনপল্লির মাটির উল্লেখ বিশেষভাবে আলোচিত।
প্রচলিত একটি ব্যাখ্যায় বলা হয়, যৌনপল্লিতে যাওয়া ব্যক্তিরা নিজেদের পুণ্য সেখানে রেখে পাপ নিয়ে ফিরে আসেন। সেই বিশ্বাস থেকেই ওই এলাকার মাটিকে পুণ্যময় মনে করা হয়। তবে এটি মূলত লোককথাভিত্তিক ব্যাখ্যা। এ ধারণার ঐতিহাসিক উৎস ও শাস্ত্রীয় ভিত্তি নিয়ে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ সীমিত; তাই একে সর্বজনস্বীকৃত ধর্মীয় বিধান হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়।
সামাজিক বৈষম্য নিয়ে যে ব্যাখ্যা
এই প্রথার আরেকটি বহুল আলোচিত দিক হলো সামাজিক অন্তর্ভুক্তি। সমাজের একটি অংশ যৌনকর্মীদের প্রতি অবজ্ঞা ও বৈষম্যমূলক আচরণ করলেও তাঁদের বসতির মাটি দেবীর প্রতিমা নির্মাণে ব্যবহারের রীতিকে অনেকে প্রতীকীভাবে ব্যাখ্যা করেন।
এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সমাজে প্রান্তিক অবস্থানে থাকা মানুষদেরও বৃহত্তর সমাজের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি। দেবী দুর্গাকে মাতৃরূপে কল্পনা করার সঙ্গে বিষয়টি যুক্ত করে কেউ কেউ বলেন, ধর্মীয় আরাধনার পরিসরে মানুষের মর্যাদা ও অন্তর্ভুক্তির ভাবনাও গুরুত্ব পেতে পারে।
তবে এটি মূলত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যাখ্যা। মাটি ব্যবহারের রীতির অর্থ নিয়ে সবার মত এক নয়। তাই এই প্রথাকে শুধু একটি ব্যাখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে লোকবিশ্বাস, আঞ্চলিক ঐতিহ্য ও সামাজিক চিন্তার সমন্বয়ে দেখা প্রয়োজন।
কীভাবে সংগ্রহ করা হয় মাটি?
প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, কোনো কোনো স্থানে পুরোহিত বা প্রতিমাশিল্পী যৌনপল্লিতে গিয়ে মাটি সংগ্রহ করেন। লোকাচারের কিছু বিবরণে মাটি স্বেচ্ছায় দানের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। অর্থাৎ, মাটি সংগ্রহের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্মতি ও সদিচ্ছার কথা বলা হয়।
তবে এই আচার সর্বত্র একইভাবে পালিত হয়—এমন প্রমাণ নেই। কোথাও বাস্তবে মাটি সংগ্রহের কথা বলা হয়, আবার কোথাও রীতিটির প্রতীকী তাৎপর্যই বেশি গুরুত্ব পায়।
প্রচলিত পৌরাণিক কাহিনি
এই প্রথাকে ঘিরে বিভিন্ন পৌরাণিক ও লোককাহিনি প্রচলিত রয়েছে। এর মধ্যে একটি কাহিনিতে বলা হয়, এক কিশোরী যৌনকর্মীকে দেবী স্বপ্নে দেখা দিয়ে আশ্বস্ত করেন এবং তাঁর পূজায় ওই নারীর আঙিনার মাটি প্রয়োজন হবে বলে জানান। এই গল্পের মাধ্যমে সমাজের অবহেলিত মানুষদেরও দেবীর স্নেহের পরিসরে অন্তর্ভুক্ত করার ধারণা তুলে ধরা হয়। তবে এ কাহিনির নির্ভরযোগ্য প্রাচীন উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায় না।
আরেকটি জনপ্রিয় লোককাহিনিতে কয়েকজন যৌনকর্মীর মানবিকতার কথা বলা হয়। কাহিনি অনুযায়ী, গঙ্গায় স্নান করতে যাওয়ার পথে তাঁরা এক কুষ্ঠরোগীকে দেখতে পান, যিনি অন্যদের কাছে সাহায্য চেয়েও সাড়া পাচ্ছিলেন না। পরে ওই নারীরা তাঁকে গঙ্গাস্নানে সহায়তা করেন। এই গল্পের মূল বক্তব্য হিসেবে করুণা ও মানবিক আচরণের বিষয়টি তুলে ধরা হয়।
বিশ্বাস ও ইতিহাসের পার্থক্য বোঝা জরুরি
দুর্গাপ্রতিমা তৈরিতে যৌনপল্লির মাটি ব্যবহারের রীতি বাংলার ধর্মীয় লোকাচার নিয়ে আলোচনার একটি পরিচিত বিষয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নানা বিশ্বাস, কাহিনি ও সামাজিক ব্যাখ্যা। তবে এসব বর্ণনার সবগুলোর ঐতিহাসিক বা শাস্ত্রীয় ভিত্তি সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়।
তাই প্রচলিত বিশ্বাসকে ধর্মীয় ইতিহাসের নিশ্চিত তথ্য হিসেবে ধরে নেওয়ার আগে নির্ভরযোগ্য উৎস যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে এই রীতিকে ঘিরে আলোচনায় যৌনকর্মীদের সামাজিক মর্যাদা, মানবিক অধিকার ও বৈষম্যের বিষয়গুলোও বিবেচনায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৭ অক্টোবর ২০২৬
দুর্গাপ্রতিমা তৈরিতে যৌনপল্লির মাটি ব্যবহারের প্রচলন, নেপথ্যে কী বিশ্বাস?
শারদীয় দুর্গোৎসবে দেবী দুর্গার প্রতিমা তৈরির সঙ্গে জড়িয়ে আছে নানা ধর্মীয় আচার ও লোকজ বিশ্বাস। সাধারণত নদীর পলিমাটি, খড় ও বাঁশসহ বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে প্রতিমা নির্মাণ করা হয়। তবে বাংলার কিছু অঞ্চলে প্রতিমা তৈরির সঙ্গে যৌনপল্লির মাটি ব্যবহারের একটি প্রচলিত রীতির কথাও শোনা যায়। এই প্রথা ঘিরে ধর্মীয় বিশ্বাস, পৌরাণিক কাহিনি এবং সামাজিক তাৎপর্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে।
লোকাচার অনুযায়ী, যৌনপল্লি থেকে সংগ্রহ করা মাটিকে কোথাও ‘পুণ্যমাটি’, আবার কোথাও ‘নিষিদ্ধপল্লির মাটি’ বলা হয়। প্রচলিত বর্ণনায়, এই মাটি প্রতিমা তৈরির অন্যান্য উপকরণের সঙ্গে মেশানো হয়। তবে সব জায়গায় এ রীতি অনুসরণ করা হয় না। অঞ্চল, মন্দির ও প্রতিমাশিল্পীদের নিজস্ব রীতিভেদে এর চর্চায় পার্থক্য রয়েছে।
‘পুণ্যমাটি’ নিয়ে প্রচলিত বিশ্বাস
দুর্গাপ্রতিমা তৈরির উপকরণ নিয়ে বিভিন্ন লোকাচারে গঙ্গার পলিমাটি, গোবর, গোমূত্রসহ কয়েকটি উপাদানের উল্লেখ পাওয়া যায়। কিছু বর্ণনায় সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষের বসতভিটার মাটির কথাও বলা হয়েছে। এর মধ্যে যৌনপল্লির মাটির উল্লেখ বিশেষভাবে আলোচিত।
প্রচলিত একটি ব্যাখ্যায় বলা হয়, যৌনপল্লিতে যাওয়া ব্যক্তিরা নিজেদের পুণ্য সেখানে রেখে পাপ নিয়ে ফিরে আসেন। সেই বিশ্বাস থেকেই ওই এলাকার মাটিকে পুণ্যময় মনে করা হয়। তবে এটি মূলত লোককথাভিত্তিক ব্যাখ্যা। এ ধারণার ঐতিহাসিক উৎস ও শাস্ত্রীয় ভিত্তি নিয়ে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ সীমিত; তাই একে সর্বজনস্বীকৃত ধর্মীয় বিধান হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়।
সামাজিক বৈষম্য নিয়ে যে ব্যাখ্যা
এই প্রথার আরেকটি বহুল আলোচিত দিক হলো সামাজিক অন্তর্ভুক্তি। সমাজের একটি অংশ যৌনকর্মীদের প্রতি অবজ্ঞা ও বৈষম্যমূলক আচরণ করলেও তাঁদের বসতির মাটি দেবীর প্রতিমা নির্মাণে ব্যবহারের রীতিকে অনেকে প্রতীকীভাবে ব্যাখ্যা করেন।
এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সমাজে প্রান্তিক অবস্থানে থাকা মানুষদেরও বৃহত্তর সমাজের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি। দেবী দুর্গাকে মাতৃরূপে কল্পনা করার সঙ্গে বিষয়টি যুক্ত করে কেউ কেউ বলেন, ধর্মীয় আরাধনার পরিসরে মানুষের মর্যাদা ও অন্তর্ভুক্তির ভাবনাও গুরুত্ব পেতে পারে।
তবে এটি মূলত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যাখ্যা। মাটি ব্যবহারের রীতির অর্থ নিয়ে সবার মত এক নয়। তাই এই প্রথাকে শুধু একটি ব্যাখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে লোকবিশ্বাস, আঞ্চলিক ঐতিহ্য ও সামাজিক চিন্তার সমন্বয়ে দেখা প্রয়োজন।
কীভাবে সংগ্রহ করা হয় মাটি?
প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, কোনো কোনো স্থানে পুরোহিত বা প্রতিমাশিল্পী যৌনপল্লিতে গিয়ে মাটি সংগ্রহ করেন। লোকাচারের কিছু বিবরণে মাটি স্বেচ্ছায় দানের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। অর্থাৎ, মাটি সংগ্রহের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্মতি ও সদিচ্ছার কথা বলা হয়।
তবে এই আচার সর্বত্র একইভাবে পালিত হয়—এমন প্রমাণ নেই। কোথাও বাস্তবে মাটি সংগ্রহের কথা বলা হয়, আবার কোথাও রীতিটির প্রতীকী তাৎপর্যই বেশি গুরুত্ব পায়।
প্রচলিত পৌরাণিক কাহিনি
এই প্রথাকে ঘিরে বিভিন্ন পৌরাণিক ও লোককাহিনি প্রচলিত রয়েছে। এর মধ্যে একটি কাহিনিতে বলা হয়, এক কিশোরী যৌনকর্মীকে দেবী স্বপ্নে দেখা দিয়ে আশ্বস্ত করেন এবং তাঁর পূজায় ওই নারীর আঙিনার মাটি প্রয়োজন হবে বলে জানান। এই গল্পের মাধ্যমে সমাজের অবহেলিত মানুষদেরও দেবীর স্নেহের পরিসরে অন্তর্ভুক্ত করার ধারণা তুলে ধরা হয়। তবে এ কাহিনির নির্ভরযোগ্য প্রাচীন উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায় না।
আরেকটি জনপ্রিয় লোককাহিনিতে কয়েকজন যৌনকর্মীর মানবিকতার কথা বলা হয়। কাহিনি অনুযায়ী, গঙ্গায় স্নান করতে যাওয়ার পথে তাঁরা এক কুষ্ঠরোগীকে দেখতে পান, যিনি অন্যদের কাছে সাহায্য চেয়েও সাড়া পাচ্ছিলেন না। পরে ওই নারীরা তাঁকে গঙ্গাস্নানে সহায়তা করেন। এই গল্পের মূল বক্তব্য হিসেবে করুণা ও মানবিক আচরণের বিষয়টি তুলে ধরা হয়।
বিশ্বাস ও ইতিহাসের পার্থক্য বোঝা জরুরি
দুর্গাপ্রতিমা তৈরিতে যৌনপল্লির মাটি ব্যবহারের রীতি বাংলার ধর্মীয় লোকাচার নিয়ে আলোচনার একটি পরিচিত বিষয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নানা বিশ্বাস, কাহিনি ও সামাজিক ব্যাখ্যা। তবে এসব বর্ণনার সবগুলোর ঐতিহাসিক বা শাস্ত্রীয় ভিত্তি সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়।
তাই প্রচলিত বিশ্বাসকে ধর্মীয় ইতিহাসের নিশ্চিত তথ্য হিসেবে ধরে নেওয়ার আগে নির্ভরযোগ্য উৎস যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে এই রীতিকে ঘিরে আলোচনায় যৌনকর্মীদের সামাজিক মর্যাদা, মানবিক অধিকার ও বৈষম্যের বিষয়গুলোও বিবেচনায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

আপনার মতামত লিখুন