দেশের শিল্প ও বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র নারায়ণগঞ্জ—এ কথা নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। পাটশিল্পের ঐতিহ্য ধরে রেখে বর্তমানে গার্মেন্টস, নিটওয়্যার, ডাইং-প্রিন্টিংসহ নানা শিল্পে সমৃদ্ধ এই জেলা লাখো মানুষের কর্মসংস্থানের উৎস হয়ে উঠেছে। বিপুল রপ্তানি আয় এবং জাতীয় জিডিপিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখার কারণে অর্থনৈতিক সক্ষমতায় নারায়ণগঞ্জ দেশের শীর্ষ অঞ্চলের একটি।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই শক্ত অবস্থানের পরও প্রশাসনিক শ্রেণিবিন্যাসে জেলাটি এখনও ‘বি’ ক্যাটাগরিতে রয়েছে—যা এক ধরনের অসামঞ্জস্য ও বৈপরীত্য তৈরি করেছে। কারণ ‘বি’ ক্যাটাগরি মানেই তুলনামূলক কম উন্নয়ন বরাদ্দ, দুর্বল অবকাঠামো পরিকল্পনা এবং বিনিয়োগে সীমাবদ্ধতা। অথচ বাস্তবে উৎপাদন ও রপ্তানিতে নারায়ণগঞ্জ অনেকাংশে ‘এ’ ক্যাটাগরির ভূমিকা পালন করছে।
এই বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে তুলে ধরছেন নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি ও সংসদ সদস্য মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু। তাঁর মতে, নারায়ণগঞ্জ দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হওয়া সত্ত্বেও প্রাপ্য মর্যাদা ও সুবিধা পাচ্ছে না, যা একটি স্পষ্ট বৈষম্য। তাঁর উদ্যোগেই সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়েছে, যা ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
একই মত দিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতারাও। চেম্বারের সিনিয়র সহ-সভাপতি ও বিকেএমইএ’র সহ-সভাপতি (অর্থ) মোরশেদ সারোয়ার সোহেল বলেন, ‘এ’ ক্যাটাগরিতে উন্নীত হওয়া কেবল সম্মানের বিষয় নয়; এটি উন্নয়ন পরিকল্পনা, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং শিল্পের টেকসই বিকাশের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। বর্তমান অবস্থান অব্যাহত থাকলে জেলার সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন হবে।
এই প্রশাসনিক বৈষম্যের প্রভাব নগর জীবনের নানা সমস্যায় স্পষ্ট। দীর্ঘদিনের হকার সংকট, চাষাঢ়া-লিংক রোডসহ বিভিন্ন এলাকায় তীব্র যানজট, বর্ষায় জলাবদ্ধতা, খাল দখল এবং অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা নাগরিক দুর্ভোগ বাড়িয়েছে। পাশাপাশি শিল্পবর্জ্য ও অপরিশোধিত পানি নদীতে পড়ায় পরিবেশ দূষণ মারাত্মক আকার নিয়েছে। স্বাস্থ্যখাতেও রয়েছে অবকাঠামোগত ঘাটতি ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব।
তবে ইতিবাচক দিকও রয়েছে। সম্প্রতি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের জন্য প্রায় ১,৪২০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন করেছে, যা জেলার গুরুত্বের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। একইভাবে, সাতক্ষীরা জেলার ‘বি’ থেকে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে উন্নীত হওয়ার উদাহরণ দেখায়—সঠিক মূল্যায়ন ও নীতিগত সিদ্ধান্ত নিলে পরিবর্তন সম্ভব।
এখন প্রশ্ন একটাই—যে জেলা দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছে, তাকে প্রশাসনিকভাবে আর কতদিন পিছিয়ে রাখা হবে? তাই নারায়ণগঞ্জকে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে উন্নীত করা এখন সময়ের দাবি, বাস্তবতার দাবি এবং জাতীয় স্বার্থে জরুরি সিদ্ধান্ত।
অর্থনৈতিক শক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নাগরিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে হলে প্রয়োজন সমন্বিত নগর পরিকল্পনা, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন এবং টেকসই উন্নয়ন উদ্যোগ।

রোববার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৯ এপ্রিল ২০২৬
দেশের শিল্প ও বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র নারায়ণগঞ্জ—এ কথা নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। পাটশিল্পের ঐতিহ্য ধরে রেখে বর্তমানে গার্মেন্টস, নিটওয়্যার, ডাইং-প্রিন্টিংসহ নানা শিল্পে সমৃদ্ধ এই জেলা লাখো মানুষের কর্মসংস্থানের উৎস হয়ে উঠেছে। বিপুল রপ্তানি আয় এবং জাতীয় জিডিপিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখার কারণে অর্থনৈতিক সক্ষমতায় নারায়ণগঞ্জ দেশের শীর্ষ অঞ্চলের একটি।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই শক্ত অবস্থানের পরও প্রশাসনিক শ্রেণিবিন্যাসে জেলাটি এখনও ‘বি’ ক্যাটাগরিতে রয়েছে—যা এক ধরনের অসামঞ্জস্য ও বৈপরীত্য তৈরি করেছে। কারণ ‘বি’ ক্যাটাগরি মানেই তুলনামূলক কম উন্নয়ন বরাদ্দ, দুর্বল অবকাঠামো পরিকল্পনা এবং বিনিয়োগে সীমাবদ্ধতা। অথচ বাস্তবে উৎপাদন ও রপ্তানিতে নারায়ণগঞ্জ অনেকাংশে ‘এ’ ক্যাটাগরির ভূমিকা পালন করছে।
এই বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে তুলে ধরছেন নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি ও সংসদ সদস্য মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু। তাঁর মতে, নারায়ণগঞ্জ দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হওয়া সত্ত্বেও প্রাপ্য মর্যাদা ও সুবিধা পাচ্ছে না, যা একটি স্পষ্ট বৈষম্য। তাঁর উদ্যোগেই সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়েছে, যা ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
একই মত দিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতারাও। চেম্বারের সিনিয়র সহ-সভাপতি ও বিকেএমইএ’র সহ-সভাপতি (অর্থ) মোরশেদ সারোয়ার সোহেল বলেন, ‘এ’ ক্যাটাগরিতে উন্নীত হওয়া কেবল সম্মানের বিষয় নয়; এটি উন্নয়ন পরিকল্পনা, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং শিল্পের টেকসই বিকাশের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। বর্তমান অবস্থান অব্যাহত থাকলে জেলার সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন হবে।
এই প্রশাসনিক বৈষম্যের প্রভাব নগর জীবনের নানা সমস্যায় স্পষ্ট। দীর্ঘদিনের হকার সংকট, চাষাঢ়া-লিংক রোডসহ বিভিন্ন এলাকায় তীব্র যানজট, বর্ষায় জলাবদ্ধতা, খাল দখল এবং অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা নাগরিক দুর্ভোগ বাড়িয়েছে। পাশাপাশি শিল্পবর্জ্য ও অপরিশোধিত পানি নদীতে পড়ায় পরিবেশ দূষণ মারাত্মক আকার নিয়েছে। স্বাস্থ্যখাতেও রয়েছে অবকাঠামোগত ঘাটতি ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব।
তবে ইতিবাচক দিকও রয়েছে। সম্প্রতি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের জন্য প্রায় ১,৪২০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন করেছে, যা জেলার গুরুত্বের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। একইভাবে, সাতক্ষীরা জেলার ‘বি’ থেকে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে উন্নীত হওয়ার উদাহরণ দেখায়—সঠিক মূল্যায়ন ও নীতিগত সিদ্ধান্ত নিলে পরিবর্তন সম্ভব।
এখন প্রশ্ন একটাই—যে জেলা দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছে, তাকে প্রশাসনিকভাবে আর কতদিন পিছিয়ে রাখা হবে? তাই নারায়ণগঞ্জকে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে উন্নীত করা এখন সময়ের দাবি, বাস্তবতার দাবি এবং জাতীয় স্বার্থে জরুরি সিদ্ধান্ত।
অর্থনৈতিক শক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নাগরিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে হলে প্রয়োজন সমন্বিত নগর পরিকল্পনা, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন এবং টেকসই উন্নয়ন উদ্যোগ।

আপনার মতামত লিখুন