রাজনীতি পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ করে আর রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে ষড়যন্ত্র। নিখুঁত ষড়যন্ত্র থেকে রাষ্ট্রকে রক্ষা, ক্ষেত্রমতে পাল্টা ষড়যন্ত্রের জন্য, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত (জনগণের অর্থে রাষ্ট্রের পালিত) বেতনভুক বিভিন্ন স্তরের কর্মচারী রয়েছেন, যারা ‘গোয়েন্দা’ নামে পরিচিত। ভিন দেশে কোথাও ‘র’, ‘সিআইএ’, ‘কেজিবি’, ‘আইএস’, ‘মোসাদ’ প্রভৃতি নামে তারা পৃথিবীকে দাবড়ে বেড়াচ্ছে। ট্রাম্প-মোদি-পুতিন-কিম-জিনপিং প্রভৃতি তথাকথিত বিশ্ব মোড়লেরা এসব গোয়েন্দাদের হাতের পুতুল মাত্র। তবে শোনা যায়, রাষ্ট্রের স্বার্থের চেয়ে সরকারকে খুশি রাখার প্রতিই তারা বেশি মনোযোগী।
জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী এয়ার ভাইস মার্শাল একে খন্দকার তার ‘ভিতরে-বাহিরে’ বইতে লিখেছেন, ‘গোয়েন্দারা প্রকৃত রিপোর্টের পরিবর্তে সরকার যে রিপোর্টে খুশি হয়, সেই রিপোর্টই প্রদান করে।’
হিলারি ক্লিনটন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজিত হয়ে রাশিয়ার কেজিবিকে দায়ী করেছিলেন।
সময়ে-অসময়ে রাজনীতিবিদেরা চোরাপথে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য গোয়েন্দাদের প্রভুত্ব মেনে নিচ্ছে বৈকি!
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুদ্ধ চলছে মূলত একদিকে ইগো প্রবলেম, অন্যদিকে অর্থনৈতিক অনৈতিক চাহিদা মেটানো। এ ছাড়া অন্য কোনো কারণ নেই। জাতীয়ভাবে যা হচ্ছে, তার একমাত্র টার্গেট ক্ষমতা আর ক্ষমতা। ডান, বাম, নাস্তিকতা, মৌলবাদিতা, আদর্শিক দর্শন প্রভৃতি মোনাফেকি চারিত্রিক মুখের কথা মাত্র। স্থানীয়ভাবে যা চলছে, তা হলো ল্যাং মারার প্রতিযোগিতা, কাকে ল্যাং মেরে কে কার পদ-পদবি দখল এবং কার মুখের গ্রাস কে কেড়ে খাবে? আদর্শ, নীতি, সততা প্রভৃতি লোক দেখানো ছদ্মাবরণের একটি কৌশল মাত্র। সেই কৌশলে পর্যায়ক্রমে জাতি আজ ঐক্যের পরিবর্তে হয়ে পড়েছে বিষোদ্গারের একটি অধিক্ষেত্র। এ অবস্থা থেকে যারা পরিত্রাণ চায়, তারাই করে বিপ্লব/গণঅভ্যুত্থান। যা রক্তের বিনিময়ে উদ্ভাসিত হয়, সংবিধানের কাগজের ভাঁজে ভাঁজে লেখা থাকে না। সংবিধান যখন চালিকাশক্তি হারিয়ে ফেলে, তখনই শুরু হয় বিপ্লব বা গণঅভ্যুত্থানের মানসিক বীজ বপন-হাঁটি-হাঁটি পা পা করে এগিয়ে চলে। চরম পরিণতি ডেকে আনে ক্ষমতাসীনদের জন্য। যার উপমা/উদাহরণ বুঝিয়ে বলার দরকার নেই। যা ঘটছে তা চোখের সামনে ঘটেছে, যা বোঝার জন্য প্রয়োজন শুধু সুস্থ মানসিকতা ও সচেতন নিরপেক্ষ বুদ্ধিমত্তা।
রক্তের বানে রাজা আসে, রাজা যায়; কিন্তু যাদের রক্তের বিনিময়ে নতুন থেকে হয় নতুনতর রাজার আবির্ভাব, তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয় না কেন? বিগত ৫৪ বছরে বাংলাদেশে কট্টর ডান-বাম বা ধর্মভিত্তিক দল ক্ষমতায় আসেনি। পাকিস্তান সরকার নিজেদের ইসলামিক শাসনব্যবস্থার ধারক-বাহক মনে করলেও পোশাক-পরিচ্ছদে ও মুখে মুখে তারা যতটুকু ইসলাম, কার্যত তার ধারেকাছে থাকার বিষয়টি জনগণের আস্থায় আনতে পারেনি। স্বাধীন দেশে যারা ক্ষমতায় এসেছে, তারা নিজেদের একেক দল ভিন্নতরের জাতীয়তাবাদী দাবি করলেও মূলত বুর্জোয়াদের নেতৃত্বেই দলগুলো পরিচালিত হলেও কোনো কোনো নেতা নিজেদের ‘উদার গণতান্ত্রিক’ দল হিসেবে প্রচার করেন। এই বাক্যটিও ‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকার’ প্রক্রিয়া মাত্র; যা সত্যের অপলাপ। রাজনৈতিক দলগুলো যদি গণতান্ত্রিক বা উদার গণতান্ত্রিক হয়ে থাকে, তবে ক্ষমতার হাতবদলের পর বিজয়ীরা বিজিতদের ওপর খড়্্গ হাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে কেন? কেন-ইবা সৃষ্টি হয় ‘গায়েবি’ ও ‘বৈষম্য’ নামে পরিচিত মামলার সমাহার? ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে যারা অত্যাচার, নির্যাতন, মানি লন্ডারিং, ব্যাংক লুট, ভূমিদস্যুতা, ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করেছে, তাদের (প্রশাসনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ) বিচার অবশ্যই হতে হবে এবং এটা জাতির দাবি, সময়ের দাবি। কিন্তু শুধু দল করার কারণে মিথ্যা ও কাল্পনিক ঘটনা সাজিয়ে কারাবন্দী রাখা হবে কেন, যেমনটি করা হয়েছে গায়েবি মোকদ্দমা দিয়ে তৎকালীন বিরোধী দলকে, যা থেকে পঙ্গু, ভিখারি, বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তি, মৃত ব্যক্তি, হাসপাতালে অসুস্থ, কারাবন্দী কেউই বাদ যায়নি। আওয়ামীবিরোধী হলেই গায়েবি আসামি; যা ছিল পুলিশের একটি রুটিন ওয়ার্ক। বিষয়টি নোংরা ও অসাধু হলেও পুলিশের ছিল বাজিমাত। কারণ গ্রেফতারে ইনকাম, রিমান্ডে ইনকাম, নাম কাটাতে টাকা, চার্জশিট দিতেও টাকা, এমনকি নরম চার্জশিট দেওয়ার বাহানা করেও টাকা আদায়। মোটামুটি পুলিশের ছিল মহোৎসব, জনগণের ছিল নাভিশ্বাস। আওয়ামী লীগ যে পথে হেঁটেছে, সেই একই পথে যদি বিএনপি হাঁটে, তবে গণতন্ত্রের চর্চা তো একইভাবে চলবে। তাই যেই লাউ সেই কদু, ডিফারেন্স আর রইল কই? গায়েবি মামলায় পরিকল্পনাকারী ও রচয়িতাদের আইনের আওতায় আনা যায়, তবে ভবিষ্যতে রাজনীতির আকাশে কালো মেঘ জমাট বাঁধার সুযোগ হবে না। গায়েবি মামলার পরিকল্পনাকারী, রচয়িতা, বাদী, সুবিধাভোগী চিহ্নিত করার জন্য ১৯৫৬ সালের কমিশন অব ইনকোয়ারি অ্যাক্টের আওতায় একটি কমিশন গঠন হওয়া বাঞ্ছনীয়। পুলিশ ও প্রশাসন সব সময়ই সব সরকারের আমলে জামাই আদরে থাকে। পুলিশ ও প্রশাসনই নির্যাতনের জন্য সব সরকারের এমপি-মন্ত্রীদের মনোরঞ্জন করতে হিংস্র পশুর মতো জনগণের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এমপি/মন্ত্রীদের পদলেহন করে তারা পায় সুবিধামতো লোভনীয় পোস্টিং এবং সিনিয়র ডিঙিয়ে প্রমোশন। কিন্তু ক্ষমতার রদবদল হলে পুলিশ ও প্রশাসন থাকে সেইফ সাইডে। কারণে-অকারণে দীর্ঘ হাজতবাসী হয় পতিত দলের নেতাকর্মী ও আত্মীয়স্বজনেরা। এর পেছনের কারণও আছে। কারণ হলো ক্ষমতার আস্ফালন। ক্ষমতা পেলে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পাতিনেতা/সাবনেতা/উপনেতা/নেতা বা নেতার নেতা সবারই মাটিতে পা ঠেকে না, মনে হয় তারা মাটির ১ ফুট উপর দিয়ে হেঁটে চলে। গায়েবি মামলার বাদী হতো পুলিশ, বৈষম্য মামলার বাদী হয়েছে বিজয়ী নেতা/পাতিনেতা গোষ্ঠী। ক্ষেত্রমতে অনেকাংশে হয়েছে বাণিজ্য।
গত ৯ মে পুলিশপ্রধান বলেছেন, ‘পুলিশকে অনেকাংশে গুছিয়ে আনা হয়েছে।’ অপরাধ প্রতিরোধ ও চিহ্নিতকরণের জন্য ১৮৬১ সালের ২২ মার্চ ‘দ্য পুলিশ অ্যাক্ট, ১৮৬১’ প্রণয়নের মাধ্যমে রাষ্ট্রের সরাসরি তত্ত্বাবধানে পুলিশ বাহিনী গঠন করা হয়েছে। যাদের রয়েছে ১৬৫ বছরের অভিজ্ঞতা, কিন্তু প্রশাসন-মন্ত্রী-এমপিদের প্রতি পুলিশের পদলেহন কর্মকাণ্ডে মনের অবচেতন মনে ঘৃণা চলে আসে। মাহমুদুর রহমান মান্না ও নারায়ণগঞ্জে গুমের পর নিহত শুভ-এর মায়ের বক্তব্য মতে, বর্তমানে বিএনপি নেতাদের নাম বাদ না দিলে পুলিশ মামলা নেয় না; আওয়ামী লীগ আমলে অনুরূপ ভূমিকায় ছিল পুলিশ। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, জনগণের অর্থে লালিত পুলিশ জনস্বার্থে নয়, বরং আমলা-মন্ত্রী-এমপিদের মনোরঞ্জনের জন্য নিয়োজিত থাকাই তাদের প্রধান দায়িত্ব মনে করে। চাঁদাবাজদের তালিকা হচ্ছে বলে দীর্ঘ দিন যাবৎ শুনে আসছি, কিন্তু পত্রিকা খুললেই হরেক রকম চাঁদাবাজির খবর পাওয়া যাচ্ছে।
ঔপনিবেশিক ধ্যান-ধারণার রাজনীতি থেকে দেশ ও জাতি মুক্ত হতে পারেনি। সেই ধারাবাহিকতায় ক্ষমতা মানে সেবা নয়, বরং শোষণ-শাসনের একটি ব্লাঙ্ক চেক। যে কারণে এখন পর্যন্ত রাজনৈতিক দল প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ধারণ করতে পারেনি। ফলে রাজনীতির গুণগত মান মানসম্মত হয়নি। রাজনীতি এখন কোনো আদর্শিক বিষয় নয়, বরং ক্ষমতাকে পুঁজি করে নিজেদের ভাগ্যোন্নয়নের একটি হাতিয়ার। তাই আদর্শ-নীতি-নীতিমালা ভিত্তিক রাজনীতি ক্ষমতায় যাওয়ার মূল সোর্স নয়। এ দেশের ক্ষমতা নেগেটিভ চিন্তা থেকে পরিবর্তন হয়। একসময় মুসলিম লীগ অত্যন্ত জনপ্রিয় দল ছিল, কিন্তু যখন জনগণকে তারা জবাবদিহি করতে অর্থাৎ চাহিদা মেটাতে পারেনি, তখনই নেগেটিভ ভোটে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। আবার অনুরূপ আওয়ামী লীগ যখন জনগণকে জবাবদিহি করতে ব্যর্থ হয়েছে, তখনই বিএনপির জনপ্রিয়তা তুঙ্গে ওঠে। এমনিভাবে জনগণের নেতিবাচক চিন্তা থেকেই ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার উৎস সৃষ্টি হচ্ছে। বর্তমানে যারা ক্ষমতায়, তারাও যদি জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলনে ব্যর্থ হয়, তবে অনুরূপ অবস্থায় তাদেরও পড়তে হবে। স্মরণ রাখতে হবে-জনগণ কারও ক্রয় করা বস্তু নয়, ঘুমন্ত জনতা সজাগ হলে তাদের থামানো যায় না। জামায়াতে ইসলামী অনেক কৌশলে এগিয়েছে, ব্রিটিশ আমল থেকেই তারা সব সময়ই ‘ক্ষমতার’ সঙ্গে ছিল। আওয়ামী লীগ/বিএনপি দুটি দলকেই ব্যবহার করে অত্যন্ত সুকৌশলে তারা এখন রাষ্ট্রের প্রধান বিরোধী দল। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি জামায়াতকে ব্যবহার করতে পারেনি, উল্টো জামায়াত তাদেরকে ব্যবহার করে নিজেরা হয়েছে মহিরুহ। বড় বড় দলের প্রতি জনগণের নেগেটিভিটি চিন্তার প্রতিফলন থেকেই জামায়াতের সমৃদ্ধি। রাজনৈতিক দলকে কাগজে-কলমে নিষিদ্ধ করা যত সোজা, মানসিকভাবে নিষিদ্ধ করা তত সোজা নয়। ২০০৯ সালে প্রণীত আইনে আওয়ামী লীগ জামায়াতকে নিষিদ্ধ করেছে, বিএনপিকে কাগজে-কলমে নিষিদ্ধ না করলেও অত্যাচার-নির্যাতন কম করেনি। আওয়ামী লীগ কাগজে-কলমে নিষিদ্ধ হলেও ভিন্ন সুরতে ফিরে আসার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ রাজনীতি মন-মগজের বিষয় (Conceptual Matter), চিন্তা-চেতনা (Conception) মরে না, সময়ে-অসময়ে স্তব্ধ থাকে, জেগে ওঠে ভিন্নরূপে বারবার। ফলে কেউ কারও রাজনীতিকে ধ্বংস করার যে অপপ্রয়াস তা ক্ষণিকের, দীর্ঘস্থায়িত্ব লাভ করে না। পৃথিবীর ইতিহাস এর সাক্ষী। জীবনে অনেক উত্থান-পতন দেখেছি। উত্থানের অশ্রুজলের চেয়ে পতনের অশ্রুজল অনেক বিষাক্ত ও নির্মম। পতনের দৃশ্য যে দেখেছে, সে উত্থানের মজাকে আর মজা মনে করতে পারে না, বরং তখন বিষের পেয়ালায় নিজের আত্মাহুতির কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। বিচারপতি এস কে সিনহা প্রধান বিচারপতির ক্ষমতা প্রয়োগে দুদক আইনকে শক্তিশালী করে হাইকোর্টের নিজস্ব অধিকারপ্রাপ্ত (Inherent Power) ক্ষমতাকে (ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৬১ক) করেছেন সংকুচিত। এখন তিনি নিজেই নিজের গ্যাঁড়াকলে পড়েছেন। ২০০৪ সালে দুদককে অনেক মোটাতাজা ও শক্তিশালী করেছে বিএনপি। সে আইনের গ্যাঁড়াকলে বিএনপি নেতারাই বেশি জেল খেটেছেন। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হয়েছে সে আইনে, যে আইন ২০০৯ সালে তারা নিজেরাই প্রণয়ন করেছিল। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন, ‘মঙ্গল-অমঙ্গল আলাদা কিছুই নয়, একই সত্যের দুই রূপ মাত্র। যা আজ আনন্দ দেয়, কাল তা-ই হতে পারে সেই বেদনার কারণ।’
লেখক : জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও কলামিস্ট।

বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ মে ২০২৬
রাজনীতি পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ করে আর রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে ষড়যন্ত্র। নিখুঁত ষড়যন্ত্র থেকে রাষ্ট্রকে রক্ষা, ক্ষেত্রমতে পাল্টা ষড়যন্ত্রের জন্য, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত (জনগণের অর্থে রাষ্ট্রের পালিত) বেতনভুক বিভিন্ন স্তরের কর্মচারী রয়েছেন, যারা ‘গোয়েন্দা’ নামে পরিচিত। ভিন দেশে কোথাও ‘র’, ‘সিআইএ’, ‘কেজিবি’, ‘আইএস’, ‘মোসাদ’ প্রভৃতি নামে তারা পৃথিবীকে দাবড়ে বেড়াচ্ছে। ট্রাম্প-মোদি-পুতিন-কিম-জিনপিং প্রভৃতি তথাকথিত বিশ্ব মোড়লেরা এসব গোয়েন্দাদের হাতের পুতুল মাত্র। তবে শোনা যায়, রাষ্ট্রের স্বার্থের চেয়ে সরকারকে খুশি রাখার প্রতিই তারা বেশি মনোযোগী।
জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী এয়ার ভাইস মার্শাল একে খন্দকার তার ‘ভিতরে-বাহিরে’ বইতে লিখেছেন, ‘গোয়েন্দারা প্রকৃত রিপোর্টের পরিবর্তে সরকার যে রিপোর্টে খুশি হয়, সেই রিপোর্টই প্রদান করে।’
হিলারি ক্লিনটন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজিত হয়ে রাশিয়ার কেজিবিকে দায়ী করেছিলেন।
সময়ে-অসময়ে রাজনীতিবিদেরা চোরাপথে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য গোয়েন্দাদের প্রভুত্ব মেনে নিচ্ছে বৈকি!
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুদ্ধ চলছে মূলত একদিকে ইগো প্রবলেম, অন্যদিকে অর্থনৈতিক অনৈতিক চাহিদা মেটানো। এ ছাড়া অন্য কোনো কারণ নেই। জাতীয়ভাবে যা হচ্ছে, তার একমাত্র টার্গেট ক্ষমতা আর ক্ষমতা। ডান, বাম, নাস্তিকতা, মৌলবাদিতা, আদর্শিক দর্শন প্রভৃতি মোনাফেকি চারিত্রিক মুখের কথা মাত্র। স্থানীয়ভাবে যা চলছে, তা হলো ল্যাং মারার প্রতিযোগিতা, কাকে ল্যাং মেরে কে কার পদ-পদবি দখল এবং কার মুখের গ্রাস কে কেড়ে খাবে? আদর্শ, নীতি, সততা প্রভৃতি লোক দেখানো ছদ্মাবরণের একটি কৌশল মাত্র। সেই কৌশলে পর্যায়ক্রমে জাতি আজ ঐক্যের পরিবর্তে হয়ে পড়েছে বিষোদ্গারের একটি অধিক্ষেত্র। এ অবস্থা থেকে যারা পরিত্রাণ চায়, তারাই করে বিপ্লব/গণঅভ্যুত্থান। যা রক্তের বিনিময়ে উদ্ভাসিত হয়, সংবিধানের কাগজের ভাঁজে ভাঁজে লেখা থাকে না। সংবিধান যখন চালিকাশক্তি হারিয়ে ফেলে, তখনই শুরু হয় বিপ্লব বা গণঅভ্যুত্থানের মানসিক বীজ বপন-হাঁটি-হাঁটি পা পা করে এগিয়ে চলে। চরম পরিণতি ডেকে আনে ক্ষমতাসীনদের জন্য। যার উপমা/উদাহরণ বুঝিয়ে বলার দরকার নেই। যা ঘটছে তা চোখের সামনে ঘটেছে, যা বোঝার জন্য প্রয়োজন শুধু সুস্থ মানসিকতা ও সচেতন নিরপেক্ষ বুদ্ধিমত্তা।
রক্তের বানে রাজা আসে, রাজা যায়; কিন্তু যাদের রক্তের বিনিময়ে নতুন থেকে হয় নতুনতর রাজার আবির্ভাব, তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয় না কেন? বিগত ৫৪ বছরে বাংলাদেশে কট্টর ডান-বাম বা ধর্মভিত্তিক দল ক্ষমতায় আসেনি। পাকিস্তান সরকার নিজেদের ইসলামিক শাসনব্যবস্থার ধারক-বাহক মনে করলেও পোশাক-পরিচ্ছদে ও মুখে মুখে তারা যতটুকু ইসলাম, কার্যত তার ধারেকাছে থাকার বিষয়টি জনগণের আস্থায় আনতে পারেনি। স্বাধীন দেশে যারা ক্ষমতায় এসেছে, তারা নিজেদের একেক দল ভিন্নতরের জাতীয়তাবাদী দাবি করলেও মূলত বুর্জোয়াদের নেতৃত্বেই দলগুলো পরিচালিত হলেও কোনো কোনো নেতা নিজেদের ‘উদার গণতান্ত্রিক’ দল হিসেবে প্রচার করেন। এই বাক্যটিও ‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকার’ প্রক্রিয়া মাত্র; যা সত্যের অপলাপ। রাজনৈতিক দলগুলো যদি গণতান্ত্রিক বা উদার গণতান্ত্রিক হয়ে থাকে, তবে ক্ষমতার হাতবদলের পর বিজয়ীরা বিজিতদের ওপর খড়্্গ হাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে কেন? কেন-ইবা সৃষ্টি হয় ‘গায়েবি’ ও ‘বৈষম্য’ নামে পরিচিত মামলার সমাহার? ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে যারা অত্যাচার, নির্যাতন, মানি লন্ডারিং, ব্যাংক লুট, ভূমিদস্যুতা, ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করেছে, তাদের (প্রশাসনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ) বিচার অবশ্যই হতে হবে এবং এটা জাতির দাবি, সময়ের দাবি। কিন্তু শুধু দল করার কারণে মিথ্যা ও কাল্পনিক ঘটনা সাজিয়ে কারাবন্দী রাখা হবে কেন, যেমনটি করা হয়েছে গায়েবি মোকদ্দমা দিয়ে তৎকালীন বিরোধী দলকে, যা থেকে পঙ্গু, ভিখারি, বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তি, মৃত ব্যক্তি, হাসপাতালে অসুস্থ, কারাবন্দী কেউই বাদ যায়নি। আওয়ামীবিরোধী হলেই গায়েবি আসামি; যা ছিল পুলিশের একটি রুটিন ওয়ার্ক। বিষয়টি নোংরা ও অসাধু হলেও পুলিশের ছিল বাজিমাত। কারণ গ্রেফতারে ইনকাম, রিমান্ডে ইনকাম, নাম কাটাতে টাকা, চার্জশিট দিতেও টাকা, এমনকি নরম চার্জশিট দেওয়ার বাহানা করেও টাকা আদায়। মোটামুটি পুলিশের ছিল মহোৎসব, জনগণের ছিল নাভিশ্বাস। আওয়ামী লীগ যে পথে হেঁটেছে, সেই একই পথে যদি বিএনপি হাঁটে, তবে গণতন্ত্রের চর্চা তো একইভাবে চলবে। তাই যেই লাউ সেই কদু, ডিফারেন্স আর রইল কই? গায়েবি মামলায় পরিকল্পনাকারী ও রচয়িতাদের আইনের আওতায় আনা যায়, তবে ভবিষ্যতে রাজনীতির আকাশে কালো মেঘ জমাট বাঁধার সুযোগ হবে না। গায়েবি মামলার পরিকল্পনাকারী, রচয়িতা, বাদী, সুবিধাভোগী চিহ্নিত করার জন্য ১৯৫৬ সালের কমিশন অব ইনকোয়ারি অ্যাক্টের আওতায় একটি কমিশন গঠন হওয়া বাঞ্ছনীয়। পুলিশ ও প্রশাসন সব সময়ই সব সরকারের আমলে জামাই আদরে থাকে। পুলিশ ও প্রশাসনই নির্যাতনের জন্য সব সরকারের এমপি-মন্ত্রীদের মনোরঞ্জন করতে হিংস্র পশুর মতো জনগণের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এমপি/মন্ত্রীদের পদলেহন করে তারা পায় সুবিধামতো লোভনীয় পোস্টিং এবং সিনিয়র ডিঙিয়ে প্রমোশন। কিন্তু ক্ষমতার রদবদল হলে পুলিশ ও প্রশাসন থাকে সেইফ সাইডে। কারণে-অকারণে দীর্ঘ হাজতবাসী হয় পতিত দলের নেতাকর্মী ও আত্মীয়স্বজনেরা। এর পেছনের কারণও আছে। কারণ হলো ক্ষমতার আস্ফালন। ক্ষমতা পেলে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পাতিনেতা/সাবনেতা/উপনেতা/নেতা বা নেতার নেতা সবারই মাটিতে পা ঠেকে না, মনে হয় তারা মাটির ১ ফুট উপর দিয়ে হেঁটে চলে। গায়েবি মামলার বাদী হতো পুলিশ, বৈষম্য মামলার বাদী হয়েছে বিজয়ী নেতা/পাতিনেতা গোষ্ঠী। ক্ষেত্রমতে অনেকাংশে হয়েছে বাণিজ্য।
গত ৯ মে পুলিশপ্রধান বলেছেন, ‘পুলিশকে অনেকাংশে গুছিয়ে আনা হয়েছে।’ অপরাধ প্রতিরোধ ও চিহ্নিতকরণের জন্য ১৮৬১ সালের ২২ মার্চ ‘দ্য পুলিশ অ্যাক্ট, ১৮৬১’ প্রণয়নের মাধ্যমে রাষ্ট্রের সরাসরি তত্ত্বাবধানে পুলিশ বাহিনী গঠন করা হয়েছে। যাদের রয়েছে ১৬৫ বছরের অভিজ্ঞতা, কিন্তু প্রশাসন-মন্ত্রী-এমপিদের প্রতি পুলিশের পদলেহন কর্মকাণ্ডে মনের অবচেতন মনে ঘৃণা চলে আসে। মাহমুদুর রহমান মান্না ও নারায়ণগঞ্জে গুমের পর নিহত শুভ-এর মায়ের বক্তব্য মতে, বর্তমানে বিএনপি নেতাদের নাম বাদ না দিলে পুলিশ মামলা নেয় না; আওয়ামী লীগ আমলে অনুরূপ ভূমিকায় ছিল পুলিশ। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, জনগণের অর্থে লালিত পুলিশ জনস্বার্থে নয়, বরং আমলা-মন্ত্রী-এমপিদের মনোরঞ্জনের জন্য নিয়োজিত থাকাই তাদের প্রধান দায়িত্ব মনে করে। চাঁদাবাজদের তালিকা হচ্ছে বলে দীর্ঘ দিন যাবৎ শুনে আসছি, কিন্তু পত্রিকা খুললেই হরেক রকম চাঁদাবাজির খবর পাওয়া যাচ্ছে।
ঔপনিবেশিক ধ্যান-ধারণার রাজনীতি থেকে দেশ ও জাতি মুক্ত হতে পারেনি। সেই ধারাবাহিকতায় ক্ষমতা মানে সেবা নয়, বরং শোষণ-শাসনের একটি ব্লাঙ্ক চেক। যে কারণে এখন পর্যন্ত রাজনৈতিক দল প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ধারণ করতে পারেনি। ফলে রাজনীতির গুণগত মান মানসম্মত হয়নি। রাজনীতি এখন কোনো আদর্শিক বিষয় নয়, বরং ক্ষমতাকে পুঁজি করে নিজেদের ভাগ্যোন্নয়নের একটি হাতিয়ার। তাই আদর্শ-নীতি-নীতিমালা ভিত্তিক রাজনীতি ক্ষমতায় যাওয়ার মূল সোর্স নয়। এ দেশের ক্ষমতা নেগেটিভ চিন্তা থেকে পরিবর্তন হয়। একসময় মুসলিম লীগ অত্যন্ত জনপ্রিয় দল ছিল, কিন্তু যখন জনগণকে তারা জবাবদিহি করতে অর্থাৎ চাহিদা মেটাতে পারেনি, তখনই নেগেটিভ ভোটে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। আবার অনুরূপ আওয়ামী লীগ যখন জনগণকে জবাবদিহি করতে ব্যর্থ হয়েছে, তখনই বিএনপির জনপ্রিয়তা তুঙ্গে ওঠে। এমনিভাবে জনগণের নেতিবাচক চিন্তা থেকেই ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার উৎস সৃষ্টি হচ্ছে। বর্তমানে যারা ক্ষমতায়, তারাও যদি জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলনে ব্যর্থ হয়, তবে অনুরূপ অবস্থায় তাদেরও পড়তে হবে। স্মরণ রাখতে হবে-জনগণ কারও ক্রয় করা বস্তু নয়, ঘুমন্ত জনতা সজাগ হলে তাদের থামানো যায় না। জামায়াতে ইসলামী অনেক কৌশলে এগিয়েছে, ব্রিটিশ আমল থেকেই তারা সব সময়ই ‘ক্ষমতার’ সঙ্গে ছিল। আওয়ামী লীগ/বিএনপি দুটি দলকেই ব্যবহার করে অত্যন্ত সুকৌশলে তারা এখন রাষ্ট্রের প্রধান বিরোধী দল। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি জামায়াতকে ব্যবহার করতে পারেনি, উল্টো জামায়াত তাদেরকে ব্যবহার করে নিজেরা হয়েছে মহিরুহ। বড় বড় দলের প্রতি জনগণের নেগেটিভিটি চিন্তার প্রতিফলন থেকেই জামায়াতের সমৃদ্ধি। রাজনৈতিক দলকে কাগজে-কলমে নিষিদ্ধ করা যত সোজা, মানসিকভাবে নিষিদ্ধ করা তত সোজা নয়। ২০০৯ সালে প্রণীত আইনে আওয়ামী লীগ জামায়াতকে নিষিদ্ধ করেছে, বিএনপিকে কাগজে-কলমে নিষিদ্ধ না করলেও অত্যাচার-নির্যাতন কম করেনি। আওয়ামী লীগ কাগজে-কলমে নিষিদ্ধ হলেও ভিন্ন সুরতে ফিরে আসার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ রাজনীতি মন-মগজের বিষয় (Conceptual Matter), চিন্তা-চেতনা (Conception) মরে না, সময়ে-অসময়ে স্তব্ধ থাকে, জেগে ওঠে ভিন্নরূপে বারবার। ফলে কেউ কারও রাজনীতিকে ধ্বংস করার যে অপপ্রয়াস তা ক্ষণিকের, দীর্ঘস্থায়িত্ব লাভ করে না। পৃথিবীর ইতিহাস এর সাক্ষী। জীবনে অনেক উত্থান-পতন দেখেছি। উত্থানের অশ্রুজলের চেয়ে পতনের অশ্রুজল অনেক বিষাক্ত ও নির্মম। পতনের দৃশ্য যে দেখেছে, সে উত্থানের মজাকে আর মজা মনে করতে পারে না, বরং তখন বিষের পেয়ালায় নিজের আত্মাহুতির কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। বিচারপতি এস কে সিনহা প্রধান বিচারপতির ক্ষমতা প্রয়োগে দুদক আইনকে শক্তিশালী করে হাইকোর্টের নিজস্ব অধিকারপ্রাপ্ত (Inherent Power) ক্ষমতাকে (ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৬১ক) করেছেন সংকুচিত। এখন তিনি নিজেই নিজের গ্যাঁড়াকলে পড়েছেন। ২০০৪ সালে দুদককে অনেক মোটাতাজা ও শক্তিশালী করেছে বিএনপি। সে আইনের গ্যাঁড়াকলে বিএনপি নেতারাই বেশি জেল খেটেছেন। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হয়েছে সে আইনে, যে আইন ২০০৯ সালে তারা নিজেরাই প্রণয়ন করেছিল। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন, ‘মঙ্গল-অমঙ্গল আলাদা কিছুই নয়, একই সত্যের দুই রূপ মাত্র। যা আজ আনন্দ দেয়, কাল তা-ই হতে পারে সেই বেদনার কারণ।’
লেখক : জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও কলামিস্ট।

আপনার মতামত লিখুন